ফুলেশ্বরীর আত্মকথা

ফুলেশ্বরীর আত্মকথা
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নদীকথা: আমি ফুলেশ্বরী। স্বাধীন দেশের পরাধীন একটি নদী। আমার জন্ম কবে আমি জানি না। আমি যখন বাল্যশিক্ষা বইপড়ি তখন একদিন দাদুর মুখে শুনেছি আমার জন্মক্ষন। দাদুভাই ব্রহ্মপুত্রের কোলে শুয়ে শুনেছি আমার জন্মকাল। দাদুভাই বলেছে, লক্ষ বছর আগে তার কোলে জন্ম নেয় তার ছেলে নরসুন্দা। এই নরসুন্দার কোলে আমার জন্ম। আমরা আমাদের বাবা নরসুন্দার দুটি নয়নের মণি ফুলেশ্বরী ও সূতী নদী। আমাদের দু’বোনের মধ্যে আমি ছোট। এইতো গেলো জন্ম ইতিহাস।

এরপর আমরা দু’বোন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকি। রুপ যৌবণ আর ঢেউয়ের খেলায় মাথিয়ে রাখি চারপাশের প্রতিবেশী ভাইবোনদের। কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে আমাদের দু’বোনের বড় হতে দেখে কি যে খুশি প্রতিবেশী বন্ধু ও বান্ধবী…….বেতাই, কালনি, ঘৌড়াউত্তরা, মগড়া, আরো কতজন। দাদু এখন মৃত। বয়োবৃদ্ধ মূমুর্ষ বাবা বেঁচে আছেন কোন রকম। আমি আদরের ছোট মেয়ে ফুলেশ্বরীও যৌবন হারিয়ে বৃদ্ধা একটি মেয়ে।

লোকে জরাজীর্ণ শরীর দেখে মুছকি হাসে……ঘটি ডুবে নাতো নামে তালপুকুর। এক কলস পানি নেইতো আবার নাম রেখেছে ফুলেশ্বরী। কোন জমিদারের নাত বউগো তুমি? আমার ভীষণ লজ্জা হয়। এতো তাড়াতাড়ি বৃদ্ধা হয়ে যাবো কেউ ভাবেনি। আমার ভীষণ কান্না আসে। মনে মনে ভাবি এই বয়সেই জীবন ও জগত সম্পর্কে কতকিছু জেনেছি। এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পবর্ত শৃঙ্গ হিমালয়ের গঙ্গোত্রি হিমবাহে আমার গোত্রকূলের শিরমনি। মা গঙ্গার ছেলে ব্রহ্মপুত্রের নাতনি আমি।

আমি টাকা না, পাহাড় না, পবর্ত না, আমি একটি নদী। এতো বড় গোত্রে জন্ম নিয়েছি তাও আমার এতো বিপদ! প্রকৃতি ও তীরের মানুষজন মিলে আমাকে শ্বাসরোদ্ধ বৃদ্ধা বানিয়ে রেখেছে। আমি এখন কি করি? বাবা নরসুন্দার কোল থেকে দৌড় দিয়ে ছোটে এসেছিলাম কিশোরগঞ্জের নীলগঞ্জ দিয়ে তাড়াইলের তালজাঙ্গা, রাউতি, কেন্দুয়ার সামনে দিয়ে আবার বাবার কোলে। পথে লক্ষ বছরের লক্ষ কাহিনী কি মনে আছে? রোগা শরীর নিয়ে সব স্মৃতি কি মনে পড়ে? টল টল ঢেউয়ে কতপল্লিবালা স্লান করতে আসতো। নতুন বউ নাইয়র যেতো। ভাটিআলী গান গাইতো মাঝি মাল্লারা। ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি আমার বুক দিয়ে ভাটি বাংলার পাট নিতো। কৃষকের মুখে কত হাসি দেখতাম। সওদাগরের বউয়েরা আমার তীরে এসে চোখের টলমল জল ফেলতো, আর প্রতিক্ষার প্রহর গুনতো কবে আসবে প্রাণপতি। চোখের জল আমার গায়ে পড়লে কিযে সুখস্মৃতি পেতাম মিলনের। নববধুর বাসর ঘরের মতো। ওদের বিরহে আমি হাসতাম। আর আমার বিরহে ওরা হাসে কি না জানি না। ওদের বিরহের গানটা আজো মনে আছে।

কালা বিদেশ যাইয়ো না

এই অভাগিরে ছাইরা কালা বিদেশ যাইয়ো না।

ওরে আক্কলে ছাগল বন্ধি,

জালে বন্ধি মাছ

নারীর হাতে পুরুষ বন্ধি,

ঘুরে বারো মাস।

ও কালা বিদেশ যাইয়ো না।

সামন্ত রাজাদের বউয়ের গহনা এখনও আমার মাটির নিচে পুতা আছে। অথচ বিশ্বায়নের সামন্ত রাজারা আজ আমাকে অচল বানিয়ে রেখেছে। ১৭৭৮ এ আমাকে বন্ধা বানালো ভূমিকম্পে। বাংলার নারীর মতো প্রকৃতিও আমাকে কম জ্বালাইনি। রাউতির কুড়পাড়ে প্রবল ধস দিলো ভূমিকম্প। সেই থেকে আমি বাকরুদ্ধ। আটপৌঢ়ে শাড়ি পড়িয়ে দিল প্রকৃতি। দ্বীজ বংশীয় রাজা বংশীদাস আমার তীরে টঙং বেধে মঙ্গল কাব্যের অনুবাদ করতো। তার নাতনী চন্দ্রাবতী। পরে তা পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করে। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর বাড়ি আমার তীরে। প্রতিদিন চন্দ্রাবতী সন্ধ্যামাল্য দিতো পুজোঘরে। আমার তীরে এসে কবিতা লিখতো, গান গাইতো। জয়ানন্দ তার গান শুনে প্রেমে পড়লো। কূল যাবে কূল যাবে বলে চন্দ্রাবতীর বাবা মেনে নিল না। বেচারা জয়ানন্দ ও চন্দ্রাবতী আমার কূলে আত্মহুতি দিলো। সে যে কি স্মৃতি আমি আজও ভুলতে পারি নি।

জলদ্যুস্যু কেনারামের কবলে পড়লো রাজা বংশীদাস। সবলুটে নিলো এ কলংকের স্বাক্ষীও আমি। দ্বীনেশবাবু কেনারামের পালা লিখেছেন। আমি ফুলেশ্বরীকে নিয়ে কোন বাবু লিখবেন না? আমি যে কতোকালের স্বাক্ষী নিয়ে বেঁচে আছি। একদিন সন্ধ্যায় আমি ঘুমাতে গেলাম। আধো ঘুমে মধুর কেন্ঠে গান ভেসে আসলো আমার কানে। শ্রী উকিল গো-স্বামী, বাউল মকবুল হোসেন, আবেদ মিয়া, নিবারন পন্ডিত আমার গায়ে নৌকা ভাসিয়ে গান গাইছে……

যে দিন তুমায় দেখেছি

মনে আপন ভেবেছি।

তুমি আমায় আপন করে নিলানা

তুমি জানো না গো প্রিয়,

তুমি মোর জীবনের সাধনা।

আমার ঢেউ নেই, পানি নেই, উজানের স্রোতের পলিতে ভরাট আমার দেহ। পতিত চরে কৃষক ধান চাষ করে। দুষ্ট ছেলেরা পায়খানা শেষে আমার পানিতে সৌচাগারের কাজ করে। কি যে দুঃখ মনে আমার। আমাকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসে না। এমপি, মন্ত্রী সামন্ত রাজারা টকশো করে আমাকে দেখতে কেহই এলো না।

আমার কি মন চায় না? আবার নতুন বরের যাত্রী নৌকা দেখতে, নববধূর গোসল দেখতে, কবিদের কবিতা শুনতে, শিল্পীদের গান শুনতে। ছোট বেলায় আমি একটি সিনেমা দেখেছিলাম। সিনেমা’টির নাম ছিল ফুলেশ্বরী। নায়িকা ছিল অঞ্জনা। বিরহের শেষ দৃশ্যে খুব কেঁদেছিলাম। আমিও ফুলেশ্বরী কিশোরগঞ্জের নীলগঞ্জ হতে তাড়াইল কেন্দুয়া, ইটনার বিভিন্ন নদ-নদীতে ভরা যৌবণে মিশে ছিলাম। আজ আমার যৌবণ নেই। মানুষ আর প্রকৃতি মিলে আমাকে আবু গারিব কারাগারে বন্ধি করে রেখেছে।

আমাকে মুক্ত করবেন না আপনারা? হে নদী পাড়ের মানুষ। না হলে যে আমি ফুলেশ্বরী মরে গেলেও আপনারাও রোগা হবেন, অপরাধী হবেন। আমাকেও বাঁচান আপনারাও বাঁচুন। কিশোরী ফুলেশ্বরী হয়ে আমি আপনাদের আবার গান শুনাবো। আমি যে একটি জীবন্তস্বত্তা…….ফুলেশ্বরী।

ছবিঃ মৃতঃপ্রায় ফুলেশ্বরী নদী, বানাইল, তারাইল, কিশোরগঞ্জ।রিভার বাংলা ডট কম

লেখক:  আফজাল হোসেন আজম, শিক্ষক ও  আহব্বায়ক রিভার বাংলা নদীসভা, তাড়াইল শাখা, কিশোরগঞ্জ।

আরো পড়তে পারেন….

“নদী হারিয়ে যাচ্ছে বলে এ দেশে নজরুল, সুকান্ত ও জসীম উদ্‌দীনের মতো কবি আর জন্মাবে না”

মহানন্দা মহা আনন্দে একদমই নেই : মহানন্দা এখন নিরানন্দা

হবিগঞ্জে খোয়াই নদী বাঁচাতে অভিযান : ৮৪ স্থাপনা উচ্ছেদ

সংশ্লিষ্ট বিষয়