নদী ও পরিবেশের জন্য আশির্বাদ হয়ে এসেছে করোনা ভাইরাস ।। নদীপুত্র সুমন শামস

করোনা
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনাকালে অঘোষিত লকডাউনে দীর্ঘদিন নদীতে লঞ্চ-স্টিমার চলাচল বন্ধ থাকার কারণে বুড়িগঙ্গা নদীসহ দেশের প্রায় সকল নদ-নদীর পানির গুণগত মান বেড়েছে। পণ্যবাহী জাহাজ ছাড়া দীর্ঘ দুইমাস নদীতে চলেনি যাত্রীবাহী কোন ধরণের লঞ্চ-স্টিমার

ইঞ্জিনের ভট ভট বা ভোঁ ভোঁ শব্দ ছিলো না। একই সময়ে নদীর তীরের কলকারখানাও বন্ধ ছিল। পানিতে মিশতে পারেনি কল-কারখানার দূষিত বর্জ্য। তাই শান্ত নদীর বুকে এখন শুধু মৃদু ঢেউয়ের কলকল ধ্বনি। ঢাকার প্রধান নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা নদীর পানি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশী স্বচ্ছ। এই রকম পরিস্কার পানির বুড়িগঙ্গা নদী বাঁচাতে কলকারখানার বর্জ্য শোধনাগার পরিবেশসম্মত করতে পারলে সারা বছর নদীর পানি ব্যবহার উপযোগী থাকবে।

করোনা পরিস্থিতিতে সরকারের ঘোষণা করা সাধারণ ছুটির মধ্যে ঢাকার আশপাশের পাঁচটি নদ-নদীর পানির মানের উন্নতি হয়েছে। নদী নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন ‘নোঙর’ এর পর্যবেক্ষণে দেখা যায় বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীর পানির মান দ্বিগুণেরও বেশি উন্নত হয়েছে।

ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর দূষণের মূল দুইটি উৎসের মধ্যে অন্যতম একটি উৎস হচ্ছে দূষিত শিল্পবর্জ্য। করোনার কারণে সাধারণ ছুটিতে বেশীর ভাগ কলকারখানা বন্ধ ছিল। তাই স্বভাবতই পানির মান বাড়বে, এটা প্রত্যাশিত। একই সাথে দূষণের আরেক উৎস ওয়াসার পয়োবর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গা নিক্ষেপ করা এখনো বন্ধ হয়নি। এটি বন্ধ হলে পানির মান আরও ভালো হতো।

নদীদূষণ পরিমাপে অন্যতম এক মাপকাঠি হলো পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) মান নিরূপণ। প্রতি লিটার পানিতে ন্যূনতম ৫ মিলিগ্রাম ডিও থাকলে ওই পানি মানসম্পন্ন বলে বিবেচনা করা হয়। পানির মান বিবেচনার ক্ষেত্রে বিওডি (জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের চাহিদা) এবং সিওডি (অজৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের চাহিদা) আরও দুই মানদণ্ড। এ দুটোর পরিমাণ বেড়ে গেলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। এ দুইয়ের পরিমাণ কমে যাওয়ার অর্থ হলো দূষণের মাত্রা কমে যাওয়া। এর মানে হলো, দ্রবীভূত অক্সিজেন বেড়ে যাওয়া। নদীগুলোর দূষণ সাধারণত শুরু হয় নভেম্বর মাস থেকে। দিন দিন তা বাড়তে থাকে। এপ্রিল মাসে দূষণ চরম অবস্থায় পৌঁছায়। এপ্রিল মাসকেই দূষণের সবচেয়ে বড় সময় বলে মনে করে অধিদপ্তর। সরকারি এ দপ্তরের গত তিন বছরের পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা গেছে, পাঁচ নদীর পানির মান চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বেশ বেড়েছে।

ঢাকার প্রধান নদী বুড়িগঙ্গার পানি গত ২০১৯ সালে বুড়িগঙ্গার মিরপুর সেতুর কাছের পানিতে ডিওর পরিমাণ ছিল শূন্য শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক শূন্য ২ মিলিগ্রাম। গত বছরের এপ্রিলে বিওডি ছিল ২০ মিলিগ্রাম। এ বছরও এর মানের কোনো হেরফের হয়নি। তবে গত বছর এপ্রিলে এখানকার পানিতে সিওডি ছিল ৯২ মিলিগ্রাম, যা এবার ৭৬ মিলিগ্রাম।

গাবতলী সেতুর কাছে তুরাগ নদে গত বছর এপ্রিল মাসে ডিও ছিল শূন্য দশমিক ১২ মিলিগ্রাম। এ বছর এর ডিওর পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। আশুলিয়ায় তুরাগের ডিও ২০১৯ ছিল শূন্য মিলিগ্রাম। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

শিল্পবর্জ্যের দূষণে বিপর্যস্ত শীতলক্ষ্যা। নদীর দুপাশ দিয়ে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার একাধিক কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার নেই। সেই দূষিত নদীতেও এবার প্রাণ ফিরে এসেছে। এ নদীর ডেমরা ঘাট ও এসিআই এলাকায় গত বছর ডিও ছিল যথাক্রমে ১ ও ১ দশমিক ২ মিলিগ্রাম। এবার তা হয়েছে ১ দশমিক ৩১ এবং ১ দশমিক ২৪ মিলিগ্রাম।

বুড়িগঙ্গা নদী, ১৪ জুলাই-২০২০, ছবি- মো.ইউসুফ আলী

বালু নদেও দূষণ আগের মতো নেই্। বালু নদের হোসেন ডায়িং এলাকার পয়েন্টে গত বছর পানিতে ডিওর পরিমাণ ছিল শূন্য দশমিক ১ মিলিগ্রাম। এবার তা হয়েছে শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ। বালু নদের ব্রিজ পয়েন্টে গত বছরের এপ্রিলে পানিতে ডিওর পরিমাণ ছিল শূন্য, এবার হয়েছে ১ দশমিক ২২ মিলিগ্রাম।

করোনায় লকডাউন পরিস্থিতির, মধ্যে রাজধানীর পাঁচ নদ-নদীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুণগত মান বেড়েছে ধলেশ্বরী নদীর পানির। এ নদীতে এ বছর এপ্রিলে ডিওর পরিমাণ ন্যূনতম নির্ধারিত মাত্রা অর্থাৎ ৫ মিলিগ্রাম ছাড়িয়ে বর্তমানে ৭ দশমিক ১ অবস্থান করছে। গত বছর এ সময় ধলেশ্বরী নদীর মান ছিল ২ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম। ধলেশ্বরীর এ পয়েন্টে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসের পানির মানও পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, ওই মাসে এ পয়েন্টে পানির ডিও ছিল ১ দশমিক ৩৫ মিলিগ্রাম।

পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-১৯৯৭ অনুযায়ী, শিল্পবর্জ্য বহন করা পানিতে বিওডির সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটার পানিতে ৫০ মিলিগ্রাম এবং সিওডির ২০০ মিলিগ্রাম। শ্যামপুরে নামা বস্তিতে বিওডির পরিমাণ ১২০ মিলিগ্রাম আর সিওডি ৩৫৮ মিলিগ্রাম। লঞ্চঘাটে যেখানে এই শিল্পের বর্জ্য গিয়ে বুড়িগঙ্গায় পড়ছে, সেখানে বিওডি ৩০৪ মিলিগ্রাম এবং সিওডি ৫৪৯ মিলিগ্রাম। শিল্পবর্জ্যে হাইড্রোজেন সালফাইডের সহনীয় মাত্রা এক মিলিগ্রাম। কিন্তু নামা শ্যামপুরের পানিতে এর পরিমাণ ১২৫ মিলিগ্রাম আর লঞ্চঘাটে ৯০ মিলিগ্রাম।

করোনায় লকডাউনের ফলে এই শিল্প বর্জ্যের দূষণ থেকে রেহাই পেলেও ওয়াসার পয়োবর্জ্য এখনো একটি বড় দূষণকারী হিসেবে রয়ে গেছে। পরিবেশবিদদের মতে প্রতিদিন রাজধানীতে ১৫ লাখ ঘনমিটার পয়োবর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে ১৪ লাখ ঘনমিটারই অপরিশোধিত অবস্থায় ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলোতে গিয়ে মেশে। এর থেকে রক্ষা না পেলে নদ-নদীগুলো রক্ষা রক্ষা পাবে না।

দেশের নদীগুলোকে আমরা গলা টিপে মেরে ফেলছি। এই লকডাউনে এটা প্রমাণ হয়েছে যে কি পরিমাণ শিল্প বর্জ্য প্রতিদিন নদীতে মিশে নদীর জীবন কেড়ে নিচ্ছে। যদি নদী না বাঁচে তাহলে বিপন্ন হবে পরিবেশ, বিপন্ন হবে মানব জীবন। তাই ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানোর কোনো বিকল্প নেই। আর তা করতে হলে সকল কলকারখানার বর্জ্য শোধনাগার অবশ্যই পরিবেশসম্মত আধুনিক করতে হবে।

প্রাণীবিজ্ঞানীদের মতে পানিতে জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য প্রতি লিটারে ৬ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন দরকার। আতিমাত্রার দূষণে বুড়িগঙ্গায় এর মাত্রা শূন্যে নেমে ছিল। ফলে বুড়িগঙ্গায় মাছ বা অন্য কোনো জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল না। তবে সম্প্রতি এক জরিপে বুড়িগঙ্গায় দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা ৫ মিলি গ্রাম পাওয়া গেছে। এতে মাছ বা অন্যান্য জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

এই সম্ভাবনা ধরে রাখতে নদীকে আরো নিরাপদ করতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষির্কী উপলক্ষে দেশের ১০০টি নদ-নদীর তীরে সবুজ বেষ্টনি গড়ে তুলতে শুরু করেছ নদী নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন নোঙর। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ নদীসহ দেশের ৬৪ জেলার নোঙর অতন্দ্র প্রহরীরা বিভিন্ন জাতির ফুলগাছ, ফলদ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণ করার কাজ অব্যাহত রেখেছে। দীর্ঘ বছরের নদীর ক্ষত নিরাময় করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিনরাত নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে হবে।

নোঙর এর অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তাদের বাণিজ্যিক আচরণ দেশের নদ-নদীর তীরভূমিতে বড় বড় কল-কারখানাসহ বিভিন্ন ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিয়ে নদী দখল করতে সহযোগিতা করেছে। ইজারা প্রথার মাধ্যমে নদীর তীর ভূমিতে হাটবাজার, মার্কেট, দোকান, ঘরবাড়ি নির্মাণ করে চিরদিনের জন্য ব্যাক্তি মালিকানায় দখল করতে সুবিধা করে দিয়েছে।

শুধু তাই নয়, শাখা নদী, খাল-বিল, হাওর বাওড় নদী প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। টাকার লোভে দেশের শতশত খালের উপরে বেলী সেতু নির্মাণ না করে কালভার্ট নিমার্ণ করে দেশের সকল নদ-নদীকে বিচ্ছিন্ন করার কাজ করেছেন সরকারের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীরা। কোথাও কোথাও পরিকল্পিত ভাবে প্রবাহমান খালের উপর পাইপ দিয়ে উপরে সড়ক পথ নির্মাণ করে চলেছেন তারা! এক কথায় যে কোন নৌবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া অথবা আসার সময় নদী থেকে যে কোন নৌকা খাল, বিল পেড়িয়ে প্রত্যেক গ্রামের বাড়ির ঘাটে চলাচল করতে পারতো সেটা এখন পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। তার সাথে বিলুপ্ত হয়েছে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের মাছ, জলজ প্রাণী। ক্ষতি হয়েছে প্রাণ- প্রকৃতির।

সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা আরো জোড়ালো থাকার কথা ছিলো নিশ্চই! কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদ্মা-মেঘনা-যমুনার প্রতি উদাস হয়ে দেশপ্রেম ভুলে গেছে কতিপয় অসৎ কর্মকর্তাগণ।

বর্তমান সকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০০ বছরের ডেল্টা প্ল্যান ঘোষণা করেছেন নদীমাতৃক বাংলাদেশের ঠিকানা পুনরায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে। এই সময়ের করোনা ভাইরাসের লকডাউনে দেশের সকল নদ-নদীর পানি পরিস্কার হয়েছে, পরিবেশ প্রকৃতি আরো সবুজ হয়ে উঠেছে। এখন আমাদের সকলের উচিৎ বর্তমান সময়ের নদ-নদী ও পরিবেশ প্রকৃতির ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে আরো সচেতন ভূমিকা পালন করা।

লেখক : নদীপুত্র সুমন শামস, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি- নদী নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন ‘নোঙর’ বাংলাদেশ।


আরও পড়তে পারেন….
এই সময়ের বুড়িগঙ্গা: বাড়ছে পানি, বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রশস্ততা
আমার শৈশবের তুরাগ এখন অর্ধমৃত! ।। মোহাম্মাদ এজাজ
বাড়ির পাশে সিঙ্গুয়া নদী ।। এম জে এইচ বাতেন
চাঁদপুরের নদী, প্রকৃতি ও ইলিশ ।। সৌম্য সালেক

সংশ্লিষ্ট বিষয়