‘কাঁদো নদী কাঁদো’: সময়ের আয়না- রুখসানা কাজল

অতিমারির দাপটে ধরিত্রীর এই শুদ্ধিকরণ অধ্যায়ে কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এর ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসটি আবার পড়তে গিয়ে চমকে উঠলাম।বহু বছর আগে পড়েছিলাম। কিন্তু তখন যে ভাবনাটি আমার মনোজগতে ছায়া ফেলেছিল তা ছিল অতি সাধারণ। কয়েকটি সকরুণ চিত্র। মনে মনে কল্পনা করে নিয়েছিলাম, মরণাপন্ন একটি নদী, যার নাম বাঁকাল, তার কূলে গড়ে ওঠা কুমুরডাঙ্গা নামে কোন এক গ্রাম। তবারক নামের একজন ব্যক্তি পুঁথিপাঠের মত বলে চলেছে সেই গ্রামের নানা গল্প। সে গল্পের সুতো ধরে এসেছে অনেকগুলো চরিত্র। কেউ সবাক। কেউবা আড়ালমুখি এবং নির্বাক। তবে সব চরিত্রকে ছাড়িয়ে বড় হয়ে উঠেছিল বাঁকাল…

মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা : নদী সংখ্যা- মনি হায়দার

নদী সংখ্যা

নদী! নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে মানব বসতি, সেই আদিকাল থেকে। আদিকালের রূপ রস গন্ধ পার হয়ে আমরা প্রবেশ করেছি চরম আধুনিক আর দখলের যুগে। আমরা, বাঙালিরা দুনিয়ায় একটি অবাক জাতি। আমাদের ভবিষৎ আমরাই ধ্বংস করি। চোখের সামনে আমাদের নদীগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে, দখল হয়ে যাচ্ছে, মরে যাচ্ছে নদীগুলো- আছে মন্ত্রী, সচিব, মহাপরিচালক, মন্ত্রনালয়, আছে প্রশাসন- সবার চোখের সামনে নদী খেকোরা খেয়ে যাচ্ছে নদী মুড়ি মুড়কির মতো, রসে চুবানো আড়াই প্যাচের জিলাপির স্বাদে- কেউ দেখার নেই। নেই রক্ষা করার কেউ। মনে হচ্ছে নদী গনিমতের মাল, একাত্তরের রাজাকারদের মতো, যে যেভাবে পারছে…

নদীর কথা ‘নদীয়ার নদী’-র মতো – সুপ্রতিম কর্মকার

নদীয়ার নদী ও জলাভূমি কথা - সুপ্রতিম কর্মকার

নদীতো নানাভাবে জীবনের কথাই বলে। জীবনের সাথে নদীর জুড়ে থাকার এক টুকরো উদাহরণ নদিয়া জেলা। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় মাঝামাঝি তার অবস্থান। নদিয়া নাম কেন হল? অনেক পণ্ডিতেরা বলেন নদী থেকেই নদিয়া নাম। এক সময় জেলাটাকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল একটা লোক ছড়া। ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদয়ে(নদিয়াতে) এল বান’। নদ-নদীতে ভর্তি ছিল নদিয়া জেলা। এক পা এগোলেই একটা করে নদী পড়তো। নদী যেহেতু আমার যাপন সংসার, তাই প্রথমে শুরু করেছিলাম অঞ্জনা নদীকে খোঁজার কাজ। রবীন্দ্রনাথের নামের সাথে যুক্ত হয়ে থাকা এক নদী। শুরু রবীন্দ্রনাথ কেন!নজরুল, মাইকেল মধুসূদন সকলেই অঞ্জনার রূপে মোহিত হয়েছিল।…

বিভূতিভূষণের ‘ইছামতী’ : মহাজীবনের মেটাফোর- সৈয়দ কামরুল হাসান

ইছামতি

১. ১৯৪৭ সালের ১৭ জুলাই ছোটভাই নুটুবিহারী বন্দোপাধ্যায়কে লেখা এক পত্রে  বিভূতিভূষণ ‘অভ্যূদয়’ নামে সাময়িকীতে তাঁর ‘ইছামতী’ উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের কথা জানিয়েছিলেন। নিজের গ্রাম বারাকপুর, তৎসন্নিহিত নদী এবং এর আশপাশ, ইংরেজ নীল চাষী, তাদের পরিত্যক্ত স্থাপনা ইত্যাদি নিয়ে একটি উপন্যাস লেখার আকাঙ্ক্ষা তিনি পোষণ করেছিলেন, যখন তিনি প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ লিখছিলেন তখন থেকেই । এ-ব্যাপারে ১৯২৮ সালে তাঁর ডায়রী ‘স্মৃতির রেখায়’ তিনি লিখে রেখেছিলেন তাঁর আগ্রহের কথা। তাঁর ভাষায়: “ঐ আমাদের গ্রামের ইছামতী নদী । আমি একটা ছবি বেশ মনে করতে পারি – ঐ রকম ধূ ধূ বালিয়াড়ী ,পাহাড়…

‘পদ্মা নদীর মাঝি’ আমাকে পদ্মায় নিয়ে ফেলে

পদ্মা

‘নদীর বই: জলের লেখাজোকা’-রিভার বাংলা’র এই আয়োজনের জন‍্যই পুনরায় পড়লাম কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। যদি বলি এই প্রথম বার তাও বলা যায়। কেননা এতটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আগে এই বহুপঠিত উপন‍্যাসটি পড়িনি। পাঠ‍্যপুস্তকে এই উপন‍্যাসের অংশবিশেষ ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ শিরোনামে পড়লেও তা তো সমগ্র ছিল না। ছিল অংশ বিশেষ। তাই তার দু-একটি সংলাপ মনের মধ‍্যে থাকলেও এবার যেন পুরো উপন‍্যাসটিই বুকের ভেতর ঢুকে এল। যদিও এই উপন‍্যাস আশ্রিত চলচ্চিত্র (নির্দেশনা: গৌতম ঘোষ) বেশ কিছু বছর আগে দেখেছি। কিন্তু পাঠ‍্যপুস্তকের পদ্মা নদীর মাঝি, চলচ্চিত্র পদ্মা নদীর মাঝি আর ক’দিন আগের পড়া পদ্মা…

অদ্বৈত মল্লবর্মণ: তিতাস একটি নদীর নাম

তিতাস

।। পলাশ মজুমদার ।। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের ভূমিকায় অদ্বৈত লিখেছেন, ‘তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙ্গে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়, রাতে চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়ে ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্তু পারে না।’ এক. বাংলা সাহিত্য কেবলমাত্র একটি উপন্যাসের জন্য একজন লেখকের কাছে ঋণী থাকবে। উপন্যাসটির নাম—‘তিতাস একটি নদীর নাম’, আর তার অমর স্রষ্টা কল্লোলযুগের নিভৃতচারী এক অসাধারণ প্রতিভাধর লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ (১৯১৪-১৯৫১)। জন্মেছিলেন বৃটিশ ভারতের অখণ্ড বাংলা প্রদেশের তৎকালীন কুমিল্লা জেলাধীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার…

“দুই বাংলার নদীকথা”- নদীমাতৃক বাংলার বিশ্বকোষ

দুই বাংলার নদীকথা

।। জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ লাহিড়ী ।।  “ দেওয়াল ঘড়ির পেন্ডুলামের মত নদী একটা নির্দিষ্ট ব্যপ্তির মধ্যে ক্রমাগত সঞ্চরণশীল থাকে। যে ব্যপ্তির মধ্যে নদী সতত গতিশীল থাকে তাকে বলে নদীর ‘মিয়েন্ডার বেল্ট’। নদীর ‘মিয়েন্ডার বেল্ট’কে তার খেলাঘর বলা যায়। যেখানে সে সক্রিয় থাকে। এই এলাকা কৃষি কাজে ব্যবহার করা গেলেও রেলপথ বা সড়কপথ নির্মাণের যোগ্য নয়। মানুষ না বুঝে নদীর খেলাঘরে ঢুকে পড়লেই বিপদ আসতে বাধ্য।”- সদ্য প্রকাশিত “দুই বাংলার নদীকথা” নামে বইতে বাংলার নদী নিয়ে তাঁর চার দশক ব্যাপী নিরলস গবেষণা ও চর্চার নির্যাসকে তুলে এনেছেন নদী বিজ্ঞানী কল্যাণ রুদ্র। নদী আমাদের…

‘মহানদী’, এক সাধারণ পাঠকের অনুভব

মহানদী

।। সুস্মিতা চক্রবর্তী ।।  মহানদী। ছত্রিশগড়ের মালভূমি থেকে নেমে এসে জগৎসিংহপুরের বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত যেতে যেতে ভারতবর্ষের মাটির সাথে বেঁধে নেয় তার ভাঙা গড়ার খেলা, যেমন নেয় সব নদীই তার নিজভূমের সাথে। নদীর নিজভূমটি ঠিক কে? সে কি মানচিত্রে দাগ টেনে দেওয়া আঁকাবাঁকা এক ভৌগোলিক জরিপের সীমানা? নাকি বয়ে যাওয়া এক গতিময় অতল? যে অতল উৎস থেকে পাড়ি দেয় মোহনা আর একইসাথে নিজেও হয়ে ওঠে অজস্র আখ্যান, লোককথা, লোকাচার, ইতিহাস, পুরাণের, বৃক্ষলতাগুল্ম, কীটপতঙ্গ, অরণ্যজীবন আর মানুষের এক মহা সংগম, এক মহা মিলনস্থল। নদীর এই দ্বিতীয় রূপটিই অনিতা অগ্নিহোত্রীর, ‘মহানদী’ উপন্যাসের উপজীব্য।এই…