কালী নদী, যেখানে ঋণী আমার শৈশব ।। মাসুম মাহমুদ

শৈশব
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নদী ভরা কূলে কূলে, ক্ষেত ভরা ধান
আমি ভাবিতেছি বসে কী গাহিব গান।
কেতকী জলের ধারে
ফুটিয়াছে ঝোপে-ঝাড়ে,
নিরাকুল ফুলভারে বকুল-বাগান
কানায় কানায় পূর্ণ আমার পরাণ।
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এখন ওই নদীর কাছে গেলে মনে হয় মায়ের মুখের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। তার স্বচ্ছ জলের চোখ আমায় দেখে যেন বলছেন, ‘কিমুন আছো, বাবা?’
বলছি কালী নদীর কথা। বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব-বাজিতপুর সীমানা হয়ে প্রিয় কুলিয়ারচরে প্রবেশ করে ভৈরবের মানিকদীর নিকটে শেষ হওয়া একটি নদী।

আমার শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের অনেকটা সময় কালী নদীর সাথে কেটেছে। ছোটবেলায় ওই নদীটার সাথে আম্মাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তিনি হাঁস-মুরগি পালতেন। তার হাঁসের খাবারের জন্য মাঝেমধ্যেই আমাকে শামুক আনতে পাঠাতেন। টিনের বোল হাতে শামুক আনতে গিয়ে এক আশ্চর্য নদী আবিস্কার করতাম। কী সুন্দর! স্নিগ্ধ, শান্ত। মুগ্ধ চোখে দেখতাম আর মনে হতো নদী তার কোমল চোখে আমায় ডাকছে। কাছে গিয়ে নদীর শরীরে হাত বুলাতেই এক অদ্ভূত ভালোলাগায় গা শিউরে উঠতো। আম্মার কল্যাণে তখন মাঝে মাঝেই সেই অদ্ভুত ভালোলাগার সকাল কাটতো প্রিয় কালী নদীর সাথে।

বাড়ির কাছে হওয়ায় নদীটার সাথে আমার অনেক স্মৃতি। এই নদীতে সাঁতার শিখেছি। মাছ ধরেছি। বন্ধুরা মিলে দলবেঁধে নৌকায় করে ঘুরে বেড়িয়েছি। শুকনো মৌসুমে নদীর পাড়ে বালির মধ্যে চিকন বাঁশের স্টাম গেঁথে ক্রিকেট খেলেছি বহুবার। নদীটা আমায় ছেড়ে কোত্থাও যায়নি।হাটবারে বাজার করতে গেলেও সে সাথে সাথে থেকেছে। সপ্তাহের শুক্রবার নদীর পাড়েই বসে কুলিয়ারচরের হাটবাজার। শুধু ব্যাগ ভরে বাজার নয়, চোখ ভরে নদীর সৌন্দর্য নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। ওই চোখে তাকালেই আম্মা বুঝতেন ফিরতে দেরি হয়েছে কেন। বর্ষায় স্কুলে আমার জানালার কাছে এসে বসে থাকতো নদী। আমি স্যারের পড়া পড়তাম আর আমার মন পড়ে থাকতো লক্ষী বালিকার মতো জানালার কাছে বসে থাকা ওই নদীর কাছে।

আরেকটু বড় হয়ে যখন যৌবনে পা রাখি, প্রেমে পড়ি; দেখতাম, আমার প্রেমিকার বাড়িটা একপাশ থেকে ওই নদী পাহারা দিয়ে রেখেছে। বাড়ির ওপারে কাছারিতে নদীর অন্যপাশে অনেক বিকেল কাটিয়েছি প্রেমিকাকে এক পলক দেখার অপেক্ষায়। একবার বর্ষাকালে, ওর বাড়ির ঘাটে বাধা নৌকার ভেতরে ওরই জন্য অপেক্ষা করছি। আমার সেই একলা অপেক্ষার একমাত্র সঙ্গী নদীর সাথে কত্তো কথা! বাতাসে কাশফুল দোলে উঠার গভীর গোপন শব্দ পায়ে নিয়ে প্রেমিকার আগমনে নদীর মুখে হঠাৎ রাও নেই। সে চুপ হয়ে গেলে আমরাও চুপচাপ তার বুকে কান পাতি। শুনতে পাই অতলে সুখের সুর। মুখে না বললেও প্রেমিকার ফিরে যাওয়ার মুখটাই বলছিল সে কি শুনেছে। এখনো মাঝে মাঝে ওই নদীর মুখে তাকালে মনে হয় সে আমার প্রেমিকার চোখ। এখনো ও চোখে আমায় না পাওয়ার বিলাপ।

কালী নদীর এপারে কুলিয়ারচর। ওপারে মানিকদি। ইঞ্জিনের নৌকা করে নদী পার হতে দশ মিনিটের মতো সময় লাগে। একবার আমরা বন্ধুরা ঠিক করলাম সাঁতরে ওপারে, অর্থাৎ মানিকদি যাবো। যেই ভাবা সেই কাজ। সবাই রওয়ানা হলাম। কিছুদূর গিয়ে সবার আগে আমি ফিরে আসি। তারপর আরেক বন্ধু। তারপর আরেকজন। একে একে সবাই। সেদিনই বুঝতে পারি, যে কোনো কাজের জন্য চাই পূর্ব প্রস্তুতি। সফল হতে হলে পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই। এসব আমি প্রথমে কালী নদীর কাছ থেকেই শিখেছি। প্রকৃতির ওই শিক্ষা বোধকরি একটা সার্থক জীবনের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে আমায়।

ওই নদীটার সাথে আমার মেঘ, বৃষ্টিরও রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। ছোটবেলায় মেঘ দেখে ভাবতাম- কোথা থেকে আসে ওরা? কেন আসে? ভেবে ভেবে ভীষণ মজা পেতাম। মেঘের আসল মজা পেয়েছি সেও আমার কালী নদীর বুকে দাড়িয়ে। সেবার অনেক মেঘ আকাশে। খুব ইচ্ছে নদীর জলে দাড়িয়ে বৃষ্টিতে ভেজার। তুমুল বৃষ্টিতে শান্ত নদী, আর নদীর কোলে আরো বেশি শান্ত আমি বৃষ্টিতে ভিজছি। সে এক অদ্ভূত ভালোলাগা। আমার হিমধরা শান্ত শরীরে সেদিন যে সুখ অনুভূত হয়েছিল, সেই সুখেই প্রবল অসুখকেও এখনো পরাজিত করতে পারি। কোথাও নিজে পরাজিত হলে শান্ত থাকতে পারি ফের ঘুরে দাড়াবার প্রত্যাশায়। নদীর থেকে এও কি কম পাওয়া?

এখনো যা কিছু সুন্দর করে দেখতে পারি, সে কি এমনি এমনি! সৌন্দর্যের অপার রহস্য নদী আমায় শিখিয়েছে। কি করে সুন্দর করে দেখতে হয় তাও। একবার কালী নদীতে নৌকা করে ঘুরবো তাই দাসপাড়া কালীবাড়ি ঘাট থেকে দুজন বন্ধুসহ ডিঙ্গি নৌকায় উঠি। এক বন্ধুর হাতে বৈঠা। সে বাইবে। নিজে জেলে হওয়ায় নৌকাটা ভালো বাইতে পারে। অন্য বন্ধু গান গাইবে। খুব সুন্দর গলা তার। আমার কাজ বৈঠায় বিস্তৃত থাকা সুর এবং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করা। ঘাটে নারী, পুরুষ আর শিশুদের স্নানের দৃশ্য যেন একটা উৎসব। নদীতে তাদের সেই উৎসবের আনন্দ নৌকায় বসে আমিও পাচ্ছিলাম সমানতালে। সেই থেকে উৎসব আমায় ছুঁয়ে যায়। ঈদ, পূজো, ১লা বৈশাখ, ২৫শে বৈশাখের মতো উৎসবে আনন্দ পাই। সেদিন আমাদের নৌকা আরেকটুু এগুলে দেখি- আরেকটি নৌকা থেকে জেলেরা মাছ ধরছেন। তাদের খুশিখুশি মুখ। ওই মুখগুলো আমায় খুশি হতে শিখিয়েছে। আজও একটুতে খুশি হতে পারার যে শক্তি আমার, সে কি কালী নদীর কাছ থেকেই পাওয়া নয়?

সেদিন মাঝ নদীতে আনন্দে ভাসছি আর দেখছি হঠাৎ হঠাৎ কুলিয়ারচর ছেড়ে লঞ্চ যাচ্ছে, আবার কখনো কখনো কুলিয়ারচরে লঞ্চ ডুকছে। লঞ্চের সম্মুখে, ছাদে, বারান্দায় কতো অপরিচিত মুখ দেখছে আমাদের, আমরাও তাদের দেখছি। মনে মনে একে অন্যের আত্মীয় হয়ে যাচ্ছি। সেই আত্মীয়তা সেদিনের সেই কালী নদীর সীমানা পেরিয়ে দেশের, ভিনদেশের কতো অপরিচিত মুখ আমায় আপন করে নিতে শিখিয়েছে। কালী নদীর কাছে কতো কি পাওয়া আমার।

কাজের সুবাধে এখন রাজধানী ঢাকায় থাকা হয়। কম যাওয়া হয় কুলিয়ারচরে। তাই কালী নদীর সঙ্গটা আর আগের মতো পাওয়া হয় না। শেষবার কুলিয়ারচরে কালী নদীতে গিয়ে দেখি তার উপরে সেতু উঠেছে। এপারে কুলিয়ারচর আর ওপারে মানিকদির মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ করে দিতে ওই সেতু। দেখতে দেখতে ভাবি-এখন আর কিশোররা সাঁতরে ওপারে যাওয়ার প্রতিযোগিতা করবে না। বড়জোর ভাববে কে কার আগে দৌড়ে যেতে পারে। এ জীবনে থামতে জানলে দৌড় শিশুর মুখের মতোই সুন্দর। এও ভাবি, ওরা সেতুর উপর বসে বিকেলের নদীতে চোখ রেখে জীবনকে বুঝতে শিখবে। জোছনার আলোয় নদীর জলে কে কার আগে নিজের মুখ দেখতে পায় সেই আয়োজনে মেতে উঠবে। সেদিন সেতুর উপর দাড়িয়ে নদীটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল আগের মতোই আছে সে। এতো অনাদর, অবহেলায়ও বদলে যায়নি। ছেড়ে যায়নি আমাদের। মনে হচ্ছিল বহু বছর পর সে আমায় নতুন করে ক্ষমা করতে শিখিয়েছে।

প্রিয় কালী নদী, বুক ভরে স্বপ্ন দেখার, প্রাণ ভরে বাঁচার যে শক্তি তুমি দিয়েছ; তার জন্য তোমার কাছে আমার শৈশব আজীবন ঋণী হয়ে থাকবে।


আরও পড়তে পারেন….
নরসুন্দায় কচুরিপনা: বর্ষায়ও পানি দেখা যাচ্ছে না
নদী কীর্তিনাশা ।। রুখসানা কাজল
আহা, এইখানে এক নদী ছিল… ।। প্রভাষ আমিন

সংশ্লিষ্ট বিষয়