আমি আর নরসুন্দা- আলিফ আলম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

                                                         মন কথন :

‘শহর’ শব্দটাকে ভাঙ্গতে গেলেই হাজারো অনুভূতিরা যেন হুড়োহুড়ি করে আমার পিছু নেয়। আমার প্রাণের শহর যেখানে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছেতে মায়ের জরায়ুর গহীন অন্ধকারে, একদিন আমার প্রথম হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠেছিল। নরসুন্দা তারই একটি নদীর নাম। জীবনের ফেলে আসা চলতি পথে হাজারও বার যার সাথে শৈশবে, কৈশোরে আর যৌবনে আমার প্রায়েই দেখা হয়েছে ।

ইতিহাসবিদদের মতে, এই নরসুন্দা নদীকে ঘিরেই আমাদের কিশোরগঞ্জ জেলা গড়ে উঠেছে। তার আরেক নাম ‘নাগচিনি ’। ব্রহ্মপুত্র নদ প্রবাহের সময় হোসেনপুর আর পাকুন্দিয়া উপজেলার মধ্য দিয়ে এসে পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে এই নদীটির সৃষ্টি হয়। নদীটি দৈর্ঘে ৫০ কি.মি, প্রস্থে ৪২ কি.মি আর গভীরতায় গড়ে ৭-৮ মিটার। তাছাড়া নদীটি কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার উপর দিয়ে প্রাবাহিত হয়েছে। এ নদী দিয়েই এক সময়ের বাংলার বার ভুঁইয়াদের প্রধান ঈশা খাঁ  ( ১৫২৯ -১৫৯৯ ) এগারসিন্ধুর থেকে জঙ্গল বাড়িতে নৌ বিহারে এসেছিলেন। তাই বলা বাহুল্য অনেক গৌরব গাঁথার সাক্ষী আমাদের এই নদী ।

কৈশোরকালে স্কুলে যাবার সময় একরামপুরের কাছে একটা ছোট পুলের পাশ দিয়ে নদীটা আমার প্রায়েই চোখে পড়ত। কচুরিপানায় পুরো নদী ছেয়ে থাকত বলে তাকে নদী বলে মনেই হতো না বরং মনে হত একটা সবুজ শাড়ি এলেবেলে হয়ে বেঁকে পড়ে আছে । এই নদী ইতিহাসের এমন তাৎপর্য বহন করে, যা আগে তেমন করে আমার কখন ও মনে হয়নি ।

একদিন স্কুল ফিরতি পথে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছিল। বৃষ্টির দাপটে ক্রমে অস্থির হয়ে কেঁপে উঠছিল চারপাশ। তার সাথে কেঁপেছিল আমার প্রাণের মত নরসুন্দার বুকের উপর থাকা কচুরিপানার সবুজপাতা আর তার বেগুনী ফুল। রিক্সাটা থেকে চোখে পড়ল, পুলের উপর ব্যাঙের লাফের মত বৃষ্টির নাচন। ভেজা পুলটা দেখে মনে হচ্ছিল, এর একটা ভাল রকম বন্দোবস্ত করা দরকার । কেমন একটা রঙচটা নড়বড়ে শরীর, তার উপর মালবোঝাই করা বড় বড় ট্র্যাক তাকে একপ্রকার তোয়াক্কা না করেই, তার বুকের উপর দিয়ে দিব্যি চলে যাচ্ছে । বৃষ্টির এমন ভারী সাদা পর্দার ভিতর দিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল, পুলের রেলিংয়ের গা ঘেঁষে উঁকি দেয়া একটা কদম ফুল । তাকে দেখে মনে হল, যেন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে লাজুক কিশোরীর মত মুখ করে, পাতার আড়ালে ফুলটা ভিজে উঠেছে। কদম গাছের ভেজা শরীর আর তার ফুটন্ত ফুলটা দেখে, হঠাৎ করেই সেদিন মনে গানটা বেজে উঠল,

“বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান,
আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান ।”

নরসুন্দার বুকের উপর দিয়ে এমন বৃষ্টিযাত্রা আর সেই ভেজা কদম ফুল আজও অন্ধকার রাতের তারার মতই আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। যে নদী এমন ঐতিহ্য বহন করে চলেছে তাকে কী না তেমন করে কোনদিন আগে আমার দেখাই হয়নি !

আজ বহু বছর পর তাকে দেখতে খুব ইচ্ছে হল। ফোনের পর্দায় চোখ রাখতেই ভেসে উঠল তার মলিন মুখ। শহরের মাঝ দিয়ে প্রাবাহিত এই নদীকে এখন আর চেনাই যায় না। নদী এখন দখল, দূষণ আর মানুষের অবহেলায় পুরনো গৌরব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে, তার রূপ যৌবন একেবারেই হারিয়েছে । একসময়ের খরস্রোতা নরসুন্দা এখন হয়ে গেছে মরা খাল। দিন দিন এর পানির পরিমাণ কমছে। মানুষের নানাবিধ ব্যবহারে এই নদী এখন ময়লার ভাগাড়! তার উপর একে ঘিরে চলে নানা সময় নানান দখল। এর বুকে দেখা যায় বোরো ধানের আবাদ! এই নদীকে ঘিরেই এই জেলার উৎপত্তি হয়েছে, অথচ তার জন্য আমাদের আলাদা কোন প্রেম কিংবা পরিচর্যা নেই !

যার ফলে কচুরিপানায় সমস্ত নদী ভরে উঠেছে। তাই নানা রোগ -ব্যধি আর মশার প্রজননের খুব ভাল একটা স্থান হিসেবে পরিণত হয়েছে আমাদের এই প্রিয় নরসুন্দা। শহরের মাঝ দিয়ে এমন একটা নদী প্রবাহ আমাদের জন্য অনেক বড় একটা পাওয়া ছিল । কিন্তু এর পাশে থাকা বিভিন্ন এলাকার মানুষ, ব্যব্যসা প্রতিষ্ঠান আর হোটেল গুলো দিন দিন এই নদীকে তাদের ইচ্ছেমত দূষিত করে তুলেছে ।

নদী উন্নয়নের জন্য নানা সময় বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও, আমাদের নদীপ্রেম না থাকার কারণে, নানা সময় এ নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দিন শেষে নদীটার জন্য আমাদের তেমন কিছুই করা হয়নি ।

একসময় এই নদীতে অনেক ছোট ছোট নৌকা চলাচল করত। আর বর্ষা এলে নদী যেন ফিরে পেত তার ভরা যৌবন। কচুরিপানার জন্য নদীটায় এখন আর কোন পানি দেখা যায় না। একে খনন করে পানি প্রবাহের ব্যবস্থা করে, দখল আর দূষণ কমিয়ে, আমরা চাইলেই নদীটাকে বাঁচাতে পারি ।
নদীটার এমন জীর্ণ অবস্থা দেখে যে তরুণ হৃদয় এই নদীকে ভালবেসে তাদের পাঁজরের গভীর অন্ধকারে প্রেম লুকিয়ে রাখ , আমরা যেন তাদেরকে সার্বিক সাহায্য করি। আমাদের কিশোরগঞ্জে জেলা নানাভাবেই সমৃদ্ধ। এই নরসুন্দা আমাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যে অনেকখানি অবদান রেখে চলেছে। এমন ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে হলেই, এই নদীটার জন্য আমাদের সবার বিশেষ দৃষ্টি প্রয়োজন

তাই প্রাণ দিয়ে বলতে চাই নদীটা বেঁচে উঠুক তার সকল প্রেমিকদের হাত ধরে। তার স্বচ্ছ জলে ভেসে উঠুক গনগনে সূর্য আর শাপলা। তার বুকের উপর ছায়া পড়ুক সেই বৃষ্টি ভেজা কদমের। বর্ষার জলে শে ফিরে পাক তার যৌবন। এরপর শুরু হোক তার বুকের উপর বৃষ্টির সেই মাতাল নাচন।

আলিফ আলম: লেখক, কানাডা।

আরও পড়তে পারেন….

নদীকৃত্য দিবসে নদী বিষয়ক বক্তৃতা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ

বড়খালের আদ্যকথা ।। সৈয়দ কামরুল হাসান

সংশ্লিষ্ট বিষয়