রাজেশ ধর এর গল্প-  ‘জলমুক্তি জিন্দাবাদ’

রাজেশ ধর এর গল্প-  ‘জলমুক্তি জিন্দাবাদ’

‘দাদ্দু, জলমুক্তি কী গ!’
চুপ করে থাকে বিষাণ সিং। কাঁধের ছেঁড়া রঙচটা লাল গামছা দিয়ে পিঠটা ঝেড়ে নেয়। মনে হয় দু-চারটে ডেউয়া পিঁপড়ে ঘুরঘুর করছে। এখনো কামড়ায়নি। বড্ড বিষ, জ্বালা করে!
‘হেই দাদ্দু, এই গামছাটো হামাক দিবা কিন্তুক। হামি ইটো লিয়ে শাড়ি বানাইবো।’

একটুখানি হাসে বিষাণ। আবার তাকিয়ে থাকে ‘দামোদরজীর’ দিকে। বর্ষা এসে গেছে, তাও দু’সপ্তাহ। কিন্তু আকাশে কালো মেঘ কই! ‘দামোদরজীর’ বুকে জল নেই। তিন মাইল চওড়া নদীর বুকে আড়াআড়ি হাত তিরিশেক জল। তার মাঝে হাত নয়-দশ গভীর, মানে বুক সমান জল। তবে স্রোত আছে। লোকজনেরা নদীকে জানে। এখানে, ওখানে মাঝামাঝি হাঁটু সমান জল। দিব্যি সেখান থেকে হেঁটে পেরিয়ে যাচ্ছে। পুব দিকে দূরে…ঐ ঘুড়িপাথরের কাছে একটা বরযাত্রীর দল, প্যান্ট গুটিয়ে, শাড়ি উঁচু করে পেরোচ্ছে। বাজনাওলাগুলো বাজাতে বাজাতেই যাচ্ছে। ঢোলের তাল ঠিক মিলছে না। সানাইআলারা আজকাল কীসব সিনেমার গান বাজায়!

তখন সানাইআলাদের বুকে জোর দম ছিল। এক ফুঁয়ে আধঘন্টার বেশি বাজাত। নাচ থামবে না…সানাই বেজেই যাবে। আর গান!
…লাথি খেয়ে আর কতদিন মরবি তোরা/ একবার রুখে দাঁড়া, একবার রুখে দাঁড়া/ দেব জবাব লাঠি আর গানের সুরে/ বাঁকুড়ার মাটিকে প্রণাম করি দিনে দুপুরে/ দামোদরজী আমার প্রণাম নিও সকাল বিকেল সাঁঝে/ বিষাণবাবু প্রণাম নিও দিনে দুপুরে…
আরো কত গান ছিল! বরযাত্রীর দলে এইসব গান না বাজালে ইজ্জত থাকত না। কীভাবে বিয়ের গান গাইতে গাইতে এই গানগুলো এসে পড়েছিল? মনে পড়ে না। আর মনে করতে ইচ্ছা করে না বিষাণের।
‘অ দাদ্দু, হুই ঘুড়ি পাথরটার দিকে তাকাইন রইছ ক্যান!… দাদ্দু…অ, দাদ্দু। হুই অত্ত বড় পাথোরটো, অমন ঘুড়ির মতন হল কী করে বটেক!’

মুখ খুলতেই হবে বিষাণের। না হলে, অ্যাত, বকরবকর করবে আর এখানে থাকাই যাবে না। এখানে এসে না বসলে ও আর যাবে কোথায়! জঙ্গলে ঢাকা ছোট টিলার সমান উঁচু পাড়ে বসে দিনরাত শুধু চুপচাপ ‘দামোদরজী’কে আর কোথায় দেখা যাবে! কেউ এখানে আসে না। কারুর সাথে কথা বলতে হয় না! আশেপাশে গাছ, পাখ-পাখালি, কাঠবিড়ালি, ঝিঁঝিঁপোকা আর সামনে ‘দামোদরজী’। শুধু এই ‘ডাকাইতন্‌’, যমুনা… একমাত্র নাতনি। রোজ ‘দাদ্দু’কে খুঁজতে, খুঁজতে এখানে চলে আসে। বিষাণের একমাত্র মেয়ে সরস্বতীর ঘরের নাতনি, ‘যমুনা’। জামাইটা সেই বিয়ের পরে পরে চলে গেল কেরালায় ঠিকাদারের কাছে, রাজমিস্ত্রির কাজে। সেই ঠিকাদার আর এল না। জামাইটাও ফিরল না। অনেক খুঁজল বিষাণ, ছাতনা, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া…পায়নি। গঙ্গা পায়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ‘কলকাতা থিক্যে তখন কত্ত, খবরের কাগজের লোক এস্যেছিল তোমার কাছ্যে। একটু যাও না কলকাতায়, দেখো না। মেয়েটো অনাথ হয়্যে যাব্যে।’ বাবা থাকতেও মেয়ে অনাথ? না, গঙ্গা খারাপ বলেনি। সে থাকা আর না থাকা তো একই কথা। কিন্তু কী করে কাগজের লোকগুলোর কাছে যেত বিষাণ? যে কাগজগুলো লিখত বড় বড় করে, ‘ ভগীরথ বিষাণ আনবে জলমুক্তি…’, ‘বিষাণের পদাঘাতে মুক্ত হবে জল…’ সেখানেই তো পরে বড় বড় করে বেরোল…। ওদের কাছে যাওয়ার থেকে গলায় দড়ি দেওয়া ভাল!
‘অ দাদ্দু, বললে না তো পাথরটো ঘুড়ি হল, তব্যে উড়ছে না কেন, বটেক!’ টেনে টেনে চিৎকার করে উঠল যমুনা।
‘উ তো পাথর, বহুৎ ভারী; আকাশে উড়তে পারে?’
‘পাথর তো অন্যরকম হয়, ইটো ঘুড়ি হল কী করে!’
‘পাগলি, উ পাথরটো এক সময় একটা বড় টিলা ছিল। তারপর দামোদরজীর পানিতে ঘষা লিগ্যে লিগ্যে অমন হই গিল।’
বিশ্বাস যেন হয় না যমুনার। তার কচি চোখদুটোতে আলোছায়া খেলতে দেখে বিষাণ। ‘ইঃ, লদীর জলের ধাক্কায় একটা ছোট পাথর যায় না, আর তুমি বলছ…’
‘লা রে দিদি, সত্যি সত্যি। বারিষের সময় দেখিস লাই! কত দূরে…আমাদের গেরাম, ঘরবাড়ি, ই জঙ্গল সব দামোদরজীর পানিতে ভরে যায়। গাই, ভইসা ভেসে যায়। বহুৎ সাল পেহেলে…’ ‘কত, সাল?’
‘কোটি কোটি বছর আগে দামোদরজীর জলে আরো তেজ ছিল। পাহাড় ভেঙ্গে গুড়োগুড়ো করেছে তখন…’
‘হাই মা…’ ‘কোটি কোটি বছর? একক, দশক করে একের পেছনে সাতটা শূন্য দিলে যে কোটি হয়, সেই কোটি!’
বিষাণ জানে যমুনা লেখাপড়ায় খুব হুঁশিয়ার। প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার বলেছিল। কেউ কেউ তাকে এখনও ডেকে কথা বলে, মাস্টারটা তেমন লোক। ছাতনা থেকে রোজ আসে। একদিন তাকে ডেকে বলল,
‘অনেক বড় কাজ করেছিলেন। আপনাকে শ্রদ্ধা করি।’
পালিয়ে এসেছিল ও। কী বলত মাস্টারকে? লোকটা কী সত্যি, সত্যি…নাকি ইচ্ছা কোরে, সবাই যেমন অপমান করে সেই জন্য…কে জানে!
‘কী গ দাদ্দু, বুললে না…জলমুক্তি কী!…বল না, বল না…’
না এবার খুব জ্বালাবে যমুনা। কিন্তু ও এসব কথা কোথায় জানল? বুকের ভেতর থেকে একটা লম্বা হাওয়া বেরিয়ে আসে বিষাণের। শুনে থাকতে পারে এখানে, ওখানে। হয়তো এখনও কেউ কেউ বলে সেই কথা। মাস্টারটা কেনই বা শ্রদ্ধার কথা বলেছিল!
‘কী গ দাদ্দু…’
‘বুলছি, বুলছি…টুকচা দম লিতে দে দিদি…জলমুক্তি…জলমুক্তি, মানে জল, পানির মুক্তি রে দিদি। পানিতে কত লোঙ্গরা পরে না! সেগুলান পরিষ্কার করতে হয়…লা করলে বিমারি হবে না!’
‘সি ত, ইস্কুলেই পড়ায়…সি লয়, দিদ্দা বলছিল। অন্য গল্প, তুমি আগে, তোমার পিছে কত লোগ!’
না এইবার মেয়েটার মুখ বন্ধ করতে হয়। কোমরের হাড়-চামড়াতে গুঁজে রাখা ছেঁড়া লুঙ্গিটার ট্যাক থেকে একটা কাঁচা টাকা বের করে যমুনার হাতে দেয় বিষাণ। ‘তু বলছিলি ইস্কুলে জান্দু দিখাবে। টাক্কা দিতে হব্যে…ই লে দিদি।’
‘ইস্‌…এক টাক্কা, হবেক লা। পাঁচ টাক্কা দিত্যে হব্যেক।’

একটা টাকাই তো ছিল! ক্যাঁন্দ পাতা তোলার মজুরি। বেশি পাতা তুলতে পারে না সে, কোমর ভেঙে আসে। সেই পদযাত্রার পর থেকেই কোমরে অসহ্য ব্যাথা। ক্যান্দ পাতা তুলে সবার সামনে ল্যাম্প অফিসে যেতে পারে না বিষাণ। কেন জানি না, লজ্জা করে এখনও। অফিস থেকে যা দেয় মুখ বুজে নিয়ে নেয়। জবকার্ড হয়নি তার, বলতেও পারেনি কাউকে…আরে সেটাই তো হবে! সে অবাক হয় না। কিন্তু এখন পাঁচটাকা কোথায় ?
‘দিত্যে হবে লা। দিখব লা জান্দু।’
বিষাণ তাকায় যমুনার মুখের দিকে। মাথার ওপরে উঁচু, উঁচু গাছের বড় বড় পাতা। আলো কম আসছে, মনে হয় মেঘও করেছে। আলো বড় কম। কম আলোয় ভালো দেখতে পায় না বিষাণ। তাও যমুনার গালে চিকচিক করছে এক দু ফোঁটা জল, ও দেখতে পায়।
‘কী হয়্যাছ্যে দিদি, কানছিস ক্যানে?’
‘লা, কান্দি লাই তো!’
‘ঝুট বলছিস…’ মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় বিষাণ। এবার সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলে যমুনা।
‘কী হয়্যাছ্যে দিদি, কী হয়্যাছ্যে?’
অনেক অনেকদিন পরে অধৈর্য হয়ে পড়ে বিষাণ। ‘দামোদর’জীর দিকে ডান হাতের তর্জনী তুলে দেখায় যমুনা।
‘কী করেছে দামোদরজী, তু কানছিস?’
‘দামোদরজী ভূত হয়্যা গ্যাছ্যে।’
‘রামজী, রামজী…ইকথা বুলতে লাই। দামদরজী আমাদের ভগমান।’
‘আগ্যে ছিল…ইখন আর লাই…ই দিখ!’

বাঁ হাতের মুঠো খোলে যমুনা। একটা মরা ছোট্ট মাছ। বিষাণ কিছুই বুঝতে পারে না। অবাক হয়ে একটু তাকিয়ে থাকে যমুনার দিকে। বোঁচা কালো নাকের দুটো পাটা কাঁপছে অল্প অল্প। ওপরের দাঁত দিয়ে অনেক কষ্টে যেন চেপে রেখেছে নীচের ঠোঁট। দুটো চোখে জল টলমল করছে। মনে পড়ে বিষাণের, রোজ সকালে, সন্ধেতে দামদরজীর জলের কাছে চলে যায় যমুনা। নুড়িগুলোর খাঁজে, খাঁজে ছোট ছোট মাছ খুঁজে বেড়ায়। কোনদিন একটা দুটো দেখতে পায়, কোনো, কোনদিন ঝাঁকও দেখতে পায়। এমন করে তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে যে মাছগুলো যদি উত্তর দিত তাহলে ও নিশ্চয় তাদের সাথে কথা বলত। জানতে চেয়েছে বিষাণ, যমুনা বলেছে। দামোদরজীর জল বেয়ে ওরা অনেকদূর থেকে এসেছে, আরো কতদূরে যাবে। ওদের সাথে ভাব করে দামোদরজীকে জানতে চায় সে। একদিন সেও ঐ মাছগুলোর মতো দামোদরজীর জল বেয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাবে।

‘চল…চল…’
বিষাণের হাত ধরে টানতে টানতে জলস্রোতের দিকে নিয়ে যায় যমুনা। ঢিপি থেকে নামতে, পাথরে, নুড়িতে ঘষা খেয়ে গা-পায়ের ছাল উঠে যায়, লুঙ্গিটা বেশ কয়েকবার খুলে যায়। যমুনার গতির সঙ্গে সে তাল মেলাতে পারে না। নুড়ি-বালুর শেষে এসে পৌঁছোয় তারা। বিষাণ দেখতে পায় ছোট, ছোট গর্তগুলোয় মরা মাছ ভাসছে। একটু দূরে আরো একটা, দুটো করে মরা মাছে ভেসে আসছে দামোদরজীর জলে। জল যে আগের থেকে অনেক কালো! ঐ ঢিপি থেকে তো এত কালো লাগে না জল!
‘দিদ্দা বুলেছে, এর আগে তুমি পেরেছিলে…আবার তুমি পারবে। ভূত তাড়াতে হবে তোমাকে…ওরা সব মরে যাবে! না হলে…আমি খাব না, ইস্কুলে যাব না…’ ফুঁপিয়ে, ফুঁপিয়ে আবার কেঁদে ওঠে যমুনা…দামোদরজীর পাড়ে। কী করবে বিষাণ…

(২)
ফোনটা হাতে দিল, সঞ্জয়।
‘বিষেণজি আপনার বাড়ি থেকে ফোন আছে।’
সঞ্জয়, বাচ্চা ছেলে বছর পঁচিশেক বয়স। টাউন থেকে একটা ছোট কাগজ বার করে। কলকাতার বড় কাগজে খবর পাঠায়। ওকে নিয়ে এসেছিল পরিমল ঝা। পরিমলের এক বন্ধুর ছেলে সঞ্জয়।
সবাই ঘরে লুকিয়ে গেলেও পরিমল বসেনি। জল নিয়ে, জঙ্গল নিয়ে কিছু হচ্ছে খবর পেলে নিজে নিজে চলে যেত। কতবার গলাধাক্কা খেয়েছে, চোর বদনাম পেয়েছে তবুও থামেনি। তারপর এখন আর কেউ কিছু বলে না। অনেক বছর আগে একবার টাউনে এসেছিল বিষেণ। দেখা হয়েছিল পরিমলের সাথে।
সে বলেছিল, ‘লিডারজি, হামি তো জানি। হামরা কুনো অন্যায় করি লাই বটে…ফির, লুকোব ক্যানে? তুমিও ফিরে এস…ই মাটি, উ জঙ্গল, উ আকাশ…দামোদরজী…সবার, হালৎ খুব খারাপ!’
পরিমলের কথাগুলো শুনতে ইচ্ছা করছিল না বিষাণের। কানে যেন শুনতে পাচ্ছিল সেই বিদ্রুপ, সেই চিৎকার, খিস্তি, সেই ঢোলের আওয়াজ
—দামোদর কো বেচকে খায়া/ বিষাণ ভায়া…বিষাণ ভায়া–
পরিমল কিন্তু বলেই যাচ্ছিল, ‘ফিরে এস লিডারজি…।’
চুপ করে থাকতে পারেনি বিষাণ, পরিমলের চোখে চোখ রেখেছিল—
‘হামাদের লিয়ে গান জুড়ত লকে, কী কর‍্যাছিলাম… গাল্লাগালি দিল, জুতা ছুড়ল!’
তারপর আর পরিমলের দিকে না তাকিয়ে চলে এসেছিল সে। রাস্তার ধারের গাছগুলোয় তখন পাখিদের খুব জোর কিচিরমিচির। সন্ধ্যা নেমেছিল। অনেকদূরে মাত্র একটা পোস্টে সাদা ম্যাড়মেড়ে আলো জ্বলছে।

এবার টাউনে এসে পরিমলের কাছেই গেল বিষাণ। পরিমল বিয়ে করেনি। সেই দামাল দিনেও ম্যাট্রিক পাশদের যেভাবে হোক একটা সরকারি চাকরি জুটে যেত। কিন্তু ম্যাট্রিকের পর বিষাণকে আর পরিমলকে ‘মিশ্রাজী’র কাছে নিয়ে গেল সত্যপাল। খাতা-কেরোসিনের জন্য পুলিশের লাঠি খেয়ে আর হাজত কাটিয়ে তখন টাউনের ছেলেদের কাছে বিষাণ আর পরিমলের খুব নাম। টগবগ করে ফুটছে। দূরের পাহড়ি গাঁয়ে বুড়ো বাবা, মা, ভাই বোনেদের কী হবে কিছু না ভেবে ঠিক করে নিয়েছে…সব পাল্টে দেওয়ার লড়াই-এ নামবে, সঙ্গী পরিমল। ‘মিশ্রাজী’ সেই লড়াই-এর বড় নেতা। কতবার জেলে গেছে, ব্রিটিশের জেলে…স্বাধীন দেশের জেলে।

কিন্তু ‘মিশ্রাজী’ বাধা দিলেন,
‘বেটা স্রিফ, এক লড়াই সে কাম বনে না…যো হাম লড় রহে হ্যায়, জমিন্দারো সে, মহাজনো সে… ও তো চলেঙ্গে… কব খতম হোঙ্গে কোই নেহি জানে। পার দুসরি ভি লড়াই হ্যায়! ওহ্‌ জিতনে সে, ইয়ে লড়াই জিতনা আসান হো যায়েগা।’
দেখা গেল দুজনের সম্বন্ধেই খুব ভালো জানেন ‘মিশ্রাজী’।
‘দিন আ রাহা হ্যায়। তুমহারা পাহাড়, জঙ্গল, নদীয়া সবকুছ ছিন লেঙ্গে ইয়ে লোগ…উসে বাঁচানে কা কাম করো বিষাণ। তুম দূর গাঁও সে হো…তুম সবকুছ আচ্ছে সে জানতে হো…লোগ তুমহে আপনা লেঙ্গে। ফির তুম লোগো কো ইয়ে লড়াই কে বারে মে বোলো…বেটা যব ধরতি হি না রহেঙ্গে তো ইনকিলাব কাহা সে আয়েগা! পারিমল ওহি কাম তুম ইহা করো। তুম দোনো গাঁও আর শ্যাহেরোকো জোড় লো…নয়া ফ্রন্ট খুলনা বহুত জরুরত হ্যায়…।’

নজর ঘুরিয়ে দিয়েছিল সেদিন ‘মিশ্রাজী’। যদিও ওনার এককামরা শুধু একটা তক্তপোষের ভাড়াঘর থেকে বেরিয়ে এসে কথাগুলো মানতে ইচ্ছা করছিল না বিষাণের। কিন্তু পরিমল বলেই যাচ্ছিল… ‘লিডার তুমি কালই ঘরকে চল্যে যাও…মাসে একবার করে আসবা…আমার মিটিন করে ঠিক কর‍্যে লিবো, কী কী করতে হবে!’
বিষাণ ঠিক করতে পারছিল না কী করবে! কিন্তু কটা বছরেই, ‘ মিশ্রাজী’ র কথা ফলে গেল। কিন্তু ততদিনে ‘মিশ্রাজী’ মহাজগতের অণু-পরমাণুতে মিলিয়ে গেছেন। টাউনের নামকরা গুন্ডা মিঠাইলালের চাকু দিনেদুপুরে মিছিলের মধ্যেই তাকে শেষ করে দিয়েছে।

(৩)
‘হ্যালো…হ্যালো…কে আছে…বাবা…কথ্যা ব্যলছো নে ক্যানে?’
চমকে ওঠে বিষাণ। হাত থেকে ফোনটা পড়েই যাচ্ছিল।
‘বল…সর…বল’, সরস্বতীকে ‘সর’ বলে ডাকে বিষাণ। একটাই মেয়ে…কত আদরের। সেই মেয়ে কতদিন পরে আজ কথা বলছে। তাও ফোনে।
‘ইটা তুমি কী করলে বাবা? এখুন কী এসব করা তোমার মানায়। আজ…এখন, তুমি থাকলে!’ কাঁদছে ‘সর’। এ কী!
‘কানছিস কেন মা?’
‘কেন কানছি? যমুনাকে বাঁকুড়ায় লিয়ে যেতে হবে হাসপিটলে। কে যাব্যে আমায় লিয়ে? এর মুধ্যে তুমি সেই আগ্যের মতো বেরিয়ে গেলে পাটি করতে? তুমি ওদের চিনো লাই। তুমায় একবার ছিবড়ে কর‍্যে দিল…আবার? মার লিগে, যমুনার লিগে, আমার লিগে একটু দরদ লাই তুমার?’
‘কী বুলছিস? তুর মা সব জানে। যমুনার জন্যই তো এলম। উরা দুজন জেদ করল বলেই…’
‘মার কথ্যার কুনো দাম আছে। থাকলে তুমি এইভাবে চইলতে পারত্যে। মেইয়েটোর জেদ তুমার মতো। যা বলবে…কিছুতেই খাবেক লাই। লদীর জলে মাছ মইরছে। ভূত তাড়াইতেন হবে…আর তুমি চলে গেলে ভূত ঝাড়াইতে? এর মইধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে লদীর জল…’
‘লদি লয় মা, বল দামোদরজী!’
‘মরুক গা তুমার দামোদরজী, ঐ জল খাইনছে যমুনা…মাছেরা খায় সিও খাবে। এখন দিখ্য…কুনো জ্ঞান লাই। জাড়ে গা জ্বালাইনছে…কী করে লিয়ে যাব এই রাতে হাসপিটলে…পোধানকে হাতে পায়ে ধর‍্যে উয়ার ফন থিকে করলম। কুথায় পাব টাকা? আই সি ডি আস-এর রান্নায় কটা ট্যাকা? কী কুরবো আমি…’ কেটে যায় ফোনটা।
ফোনটা সঞ্জয়ের হাতে ফেরত দেয় বিষাণ। সঞ্জয় তো খবরের কাগজে লেখে। একটা কিছু ব্যবস্থা করতে পারে না! সব শোনে সঞ্জয়।
‘আপনাকে পরনাম। আপনার বেটিকে পরনাম। আপনার লাতনিকেও…কিন্তুক সরকারি হসপিটালে। আর গরমেন্টের যা হাল…আমার বুয়া নার্স আছে, বাঁকুড়া মেডিকেলে। দিখবো…আপনি শুয়ে পড়ুন। রাত অনেক হল। এম এল এ ফিরেছে কলকাতা থিকে। কাল আসবে…’ চলে যায় সঞ্জয়।

এখানে ‘দামোদরজী’ অনেক চওড়া। হাওয়া দিচ্ছে ঠান্ডা। তারাগুলো চকচক করছে। সারাদিনের হাঁটার পর এখন নদীর জলে স্নান করতে ইচ্ছা করছে বিষাণের। কিন্তু যমুনা…যে জল খেল তা কি রাতের চেয়েও কালো! এম এল এ বলাই মাহাতোর বাপ কানাই মাহাতোর গায়ের রঙও ছিল খুব কালো। সবাই বলতো কালা কানাই। স্কুলে পড়ত বিষাণের সাথে। জলমুক্তির কোষাধিকারী করেছিল বিষাণ নিজেই। সবাই বলেছিল, পরিমলও, ‘বনধু, কানাই কি ভালো হবে?’ উড়িয়ে দিয়েছিল বিষাণ। কানাই তো একসাথেই হেটেছিল অতটা রাস্তা! তাকে নিয়ে সন্দেহ…ছিঃ! তার ছেলে আসছে কাল…

(৪)
এখন প্রায় গোটা পঞ্চাশ। লোক কমে গেছে অনেক। জনা কুড়ি সবাই পরিমলের চেনা। দু-একজন আগের ‘পদ্‌যাত্রা’তেও হেটেছে বিষাণদের সাথে। তাদের নিয়ে হাঁটা শুরু করেছিল বিষাণ। হাইস্কুলের ঘরে রবিবার দেখে একটা ‘মিটিন’ ডেকেছিল পরিমল। এসেছিল কমবেশি ঐ কুড়িজনই। পরিমলের খুব উৎসাহ। আবার ‘পদ্‌যাত্রা’, আবার ‘দামোদরজী’র জন্য। ওর দুটো চোখ দেখে বিষাণের মনে হছিল। কিছু করতে পেরে যেন বেঁচে গেল পরিমল। বিষাণের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলল সঞ্জয়,
‘বলাই কাকা এই জেলার পিতা। তাকে বলেছি। সেও চাইছে ‘দামোদরজীর’ ভাল হোক…সে আছে। বলাই কাকা আছে আপনার সঙ্গে।’

কয়েকটা অঞ্চল পেরোতেই পাঁচশো ছাড়িয়ে গেল লোক। আগেরবার ব্যবস্থাপনার দায় ছিল পরিমলের। সেবার টাকাপয়সার খুব সংকট ছিল। কিন্তু এবার এতগুলো লোকের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে, পরিমলকে খুব বেশি বিপদে পড়তে হচ্ছিল না। সঞ্জয় আর তার টাউনের বন্ধুরা জাদুকরের মত খাওয়া, শোওয়া, গাড়ি, মাইক, পয়সা-কড়ি জুটিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দোকানিরা জোর করে চা-জল-নাস্তা খাওয়াচ্ছিল। বিষাণ চাইছিল সেই আগের মত সব গ্রামের বটতলায় দাঁড়াবে। তারপর গান গেয়ে গেয়ে ‘কথা’ শুনাবে। কীভাবে; কেন ‘দামোদরজী’র ভূতে পেল! ‘দামোদরজীর’ লালচে জল কালো হয়ে গেল সেই তিরিশ বছর আগের মতো! কিন্তু সঞ্জয় শুধুই বাসরাস্তার পাশে জমজমাট জায়গাগুলোতেই মাইক-মঞ্চের ব্যবস্থা করে। বিষাণকে বলে,
‘সময় কম, কাজ বেশি। তাই বেশি কথা না বলে হাঁটতে হবে আর হাঁটতে হবে। ভাববেন না নেটে আর কাগজে সব খবর পৌছে যাবে।’ সবাই বলছে কথা রেখেছে সঞ্জয়।

ভূতে ধরা আর ভূত ছাড়ানোর একটা নতুন গল্প বানিয়ে বলেছে বিষাণ। লোকেরা সেই আগের মতই হাঁ করে শুনছে। কিন্তু সেই আগের মতো ‘দামোদরজী’র নামে, ওর নিজের নামে জয়ধ্বনি উঠছে না। ‘কথার’ শেষে মুখস্থ নামতার মতো আওয়াজ উঠছে— বলাই মাহাতো জিন্দাবাদ। কষ্ট একটু হলেও বিষাণ আর এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। মরতে আর বাকি কদিন! কী হবে নাম দিয়ে? ওর চিন্তা যমুনাকে নিয়ে। ‘দামোদরজী’র ভূত না ছাড়লে পাগলিটা কিছুতেই খাবে না। জানে বিষাণ। তাহলে বিষাণ ঠিক কার জন্য আবার তিরিশ বছর পর ‘পদ্‌যাত্রায়’! যমুনার জন্য, ‘দামোদরজী’র জন্য নাকি ওর নিজের জন্য। কিন্তু মিশ্রাজীকে কী কথা দিয়েছিল ও! জীবন বাজি রেখে বাঁচাবে এই জল, জঙ্গল, মাটি। তবে আর সব কথা মনে বারবার ধাক্কা দেয় কেন?
পরিমল পেছন থেকে সামনে চলে এসেছে। ওর পাশে পাশে হাঁটছে। এখনও ওর গায়ে মদ্দছেলের তাগদ! দুজনে একলা হলে বিষাণ বলে,
‘কী দোস্ত তুই বুঢ়া হবি না?’
চোখ টিপে পরিমল বলে,
‘গঙ্গা পেরোতে গিয়ে তোর মতো ঘাম-রক্ত ঝরাতে পারলম না লিডারজী!’
সেই আগের মতই আছে পরিমল। ম্যাট্রিকের আগুনে দিনগুলো থেকে সেই যে ‘লিডারজি’ বলা শুরু করল আর থামল না। অথচ কন্ট্রোলের খাতা আর কেরোসিনের দাবির সেই মিছিলে লাঠিচার্জের সময় পুলিশের হাত থেকে প্রথম লাঠি কেড়ে নিয়েছিল পরিমলই। চার পাঁচজন পুলিশ মিলে মারছিল পরিমলকে। বিষাণ ছুটে গিয়ে পরিমলকে বাঁচায়। পরিমল চিৎকার করে ওঠে—
পুলিশ তুম্‌ যিতনা মারো/ লিডার বিষাণ হ্যায় না ইয়ারো।

—পরিমলই তাকে লিডার বানিয়ে দিয়েছিল। এক ডাকে শয়ে শয়ে ছেলে নেমে যেত রাস্তায়। যেটুকু জমি ছিল, বন্ধক রেখে চাষি বাপ পাঠিয়েছিল পড়তে। প্রতি সপ্তাহে চাল-আনাজ দিয়ে যেত এতটা রাস্তা হেঁটে। ঐ টিলায়-জঙ্গলে বসে বিষাণের লেখাপড়া না জানা বাপ স্বপ্ন দেখেছিল। ছেলে ‘লিখাপড়া’ শিখে বড় চাকরি করবে। আর দুঃখ থাকবে না। সেই দিনগুলোর ঝড়ে নিভে গিয়েছিল বাপের স্বপ্ন। গ্রামে ফেরার পর বাপ আর কথা বলত না। বিষাণের তখন আর সেসব নিয়ে ভাবার সময় কোথায়। যেখানে একটা প্রাইমারি ইস্কুল দু মাইল দূরে। সেখানে ম্যাট্রিক পাশ ছেলে একেবারে গাঁয়ের মধ্যে। হাঁ করে সবাই কথা শুনত তার। বন্ধ হয়ে গেল জঙ্গলের চুরি। সরাসরি না বললেও আশেপাশের গ্রামগুলোতে জোতদাররাও বেগার খাটানো বন্ধ করে দিল। মহাজনেরা সুদের ঠিক হিসাব রাখত। অনেক চ্যালা জুটে গেল বিষাণের। তারপর পরিমলের বৌদির বোনের বিয়েতে সেই গঙ্গাপারে গিয়ে গঙ্গাকে দেখল বিষাণ। পরিমলের জন্যই বিয়ে। তারপর সরস্বতী… একে একে কত কিছু পাল্টে গেল, যমুনা এল। আবার মনে এল কথাটা। যমুনার জন্যই কি ও হাঁটছে! কেমন আছে যমুনা। দুদিন তো কোনো খবর নেওয়া হয়নি। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, ডাক্তার দেখছে এই পর্যন্ত শুনে আসছে। মনটা খুব খারাপ লাগল। পরিমলকে জিজ্ঞাসা করল বিষাণ,
‘কিমন আছে যমুনা? খবর লিছো?’
‘মাপ করো লিডারজি। জেন্যে আসছি, দাঁড়াও…’
এত ঝামেলার মধ্যে সঞ্জয়ের নার্স পিসির ফোন নাম্বার পরিমল নিজের কাছে রাখতে পারেনি। তাই ওর ফোন থেকে না পেয়ে দৌড়ে পেছন দিকে সঞ্জয়ের কাছে চলে গেল পরিমল। সঞ্জয় কিছুতেই মিছিলের সামনে আসে না। পেছনে হাঁটে। এতদিন পেছনে কিছু মোটর-সাইকেল, একটা অ্যাম্বুলেন্স আর কটা টিভির গাড়ি আসত। টিভির লোকগুলো সব সঞ্জয়ের চেনাজানা। ওরা ছবি তুলতো। দু-তিনবার বিষাণের সঙ্গেও কথা বলল। বড় ক্যামেরায় ছবি তুলল। শুরুর পরেরদিন থেকেই লোক বাড়ছিল। কিন্তু সাতদিন পরেই কমে গেল লোকজন। চলে গেল টিভির গাড়ি।

বেলা মনে হয় এগারোটা হবে। একটা মস্ত বড় শিশু গাছের নীচে পদযাত্রীরা বসে আছে। জল খাওয়ার বিশ্রাম। বিষাণ দেখল, আজ শুধুই জল। সাথে ছোলা, বাতাসা কিছুই নেই। বিষাণের কাছে সঞ্জয় আসে। বিষাণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বলতে যাবে কিন্তু তার আগেই থামিয়ে দিল সঞ্জয়,
‘আপনার নাতনি ভাল নেই। কলকাতায় নিয়ে যেতে হবে। আমার বুয়া ফোন করেছিল। কী করবেন? বাড়ি যাবেন! ব্যবস্থা করি?’
পরিমল বলেছিল ছেলেটা জল-জঙ্গল-মাটি খুব ভালবাসে। একে নিলে নতুন প্রজন্মের ছেলেরা আন্দোলনে বেশি করে আসবে। সেই সঞ্জয় এখন ওকে চলে যেতে বলছে। ও গেলেই তো ‘পদ্‌যাত্রা’ বন্ধ। তাহলে ছেলেটা কী চায়! কিন্তু যমুনার যে অবস্থা ভাল না…কী হবে! কী করতে পারে বিষাণ! বলে ফেলে সঞ্জয়কে,
‘কলকাতায় আপনার কোনো যোগাযোগ নেই…হাসপাতালে?’
অনেকটা চলে গিয়েছিল সঞ্জয়। ঘুরে বেশ জোর কদমে বিষাণের কাছে চলে এল।
‘যা করবে বলাইকাকা করবে। কলকাতা কত দূরে! আমরা ওসব জায়গায় কিছু বলতে পারি?’
একটু থেমে আবার বলল সঞ্জয়,
‘ডাকি বলাইকাকাকে…?’
যমুনার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া মুখটা চোখের সামনে দেখতে পায় বিষাণ। ‘দামোদরজী’কে বাচাঁনোর জন্য কথা দিয়েছিল বিষাণ। সেই কথা যে থাকবে না। কিন্তু যমুনা… আবার মুখ খোলে সঞ্জয়,
‘ফোন করি বলাইকাকাকে?’

(৫)
সেদিন বেশি লোক ছিল না বলাই মাহাতোর সাথে। সব মিলিয়ে চার পাঁচজন। আরো কুড়ি-পঁচিশ কিলোমিটার পুবে ‘দামোদরজী’র পাড়ে সন্ধেবেলায়। বলাই মাহাতো কোনো পরিচয় দেয়নি তার বাবার, বিষাণেরও কোনো পরিচয় নেয়নি। শুরুতে সরাসরি জানিয়ে দিল। বেশ জোরদার প্রচার হয়ে গেছে। নদীর দূষণ নিয়ে কথাটা দিল্লি অবধি পৌছে গেছে। স্টেট, সেন্ট্রাল দুজনেই বাজেট ইসু করবে। পরেরদিন দুপুরে একটা প্রেস মিটিং করে ‘পদ্‌যাত্রা’ বন্ধ করতে হবে। বিষাণের মুখ থেকে কথা সরছিল না। পরিমল বলল,
‘তার মানে যতদিন টাকা না আসবে ততদিন ঐ বিষাক্ত জল ব্যবহার করতে হবে সবাইকে?’
‘এই জল কেউ খায় না। কোটি কোটি টাকা খরচা করে পি এইচ ই-জল দিচ্ছে না?’
‘সে আমরা জানি কোথায় কত খাওয়ার জল! কিন্তু নদীর জলে জীব বৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ওই জলে চাষ হচ্ছে না। অবস্থা এমন ওই জল হাতে পায়ে লাগলে ঘা হয়ে যাচ্ছে। এমন কালো জল…’
‘কোথায় কালো? এই তো, এখানে জল ঘোলা…যেমন থাকে…’
‘সে তো আমরা অনেকটা নীচে এখন। সবকটা কারখানার ওয়েস্ট ওয়াটার এসে মিশছে একেবারে হ্রদটাতে। ওখান থেকেই তো ‘দামোদরজী’র শুরু। প্রথম দিকে ঐ জল একটু একটু করে বিষিয়ে যাচ্ছিল। আস্তে আস্তে নীচের দিকে নামছে। এরপর আরো নামবে। দু-এক বছরের মধ্যে এখানেও জল কালো হয়ে যাবে যদি কারখানাগুলো বন্ধ না করতে–’
পরিমলকে আর বাড়তে দেয়নি বলাই,
‘ঐসব বনধ্ ফনধ্-এর যুগ চলে গেছে। কাজ করতে হবে এখন। কারখানা বন্ধ?’

বলাই মাহাতোর জায়গায় একটা ছিচকাঁদুনে শিয়ালকে দেখতে পাচ্ছিল বিষাণ। সারারাত হু–হু করে ডাকে। আর গাঁয়ের কুকুরগুলো তাড়া করলেই পালায়। ভাল করে চোখ কচলাল সে। না, লোকটা বলাই মাহাতোই। কিন্তু হুক্কাহুয়া থামেনি,
‘একটা কারখানায় কত লোক কাজ করে জানা আছে?’
‘কিন্তু চাষ করে, মাছ ধরে বেঁচে আছে তার থেকেও অনেক বেশি লোক!’
‘চুপ করুন, রাজনীতি করবেন না!’
এই রে, বলাই-এর মুখটা ভেড়ির মুখ হয়ে গেল কেন? ও কি পরিমলের টুটিটা কামড়ে ধরবে?
‘এইসব ক্রান্তিকারী মোটেও চলবে না…সব বুঝি। গত্তে ঢুকেছিলেন আবার বেরিয়েছেন। কাগজে ছবি উঠে গেছে…ব্যাস্‌!’
বাঁশপেটা করে বুনোকুত্তা মারার স্মৃতি ধাক্কা দিচ্ছিল বিষাণের মগজে–
‘চলো পরিমল। পদ্‌যাত্রা নেহি রুকেগা। চুড়েল তাড়িয়ে ছাড়বো। দামোদরজীকে আবার শুধ্‌ কোরবো…’
বাঁশের বাড়িটা শিরদাঁড়ার মাঝখানে পড়ল। কুকুরটা কেউ কেউ করে মরণকামড় দিতে একটা লাফ দিল;
‘বিষাণ সিং…চোর বিষাণ সিং। এত টাকার জরুরত? আবার চুরি করতে হবে…পাঁচ লাখ মেরেও লোভ মরেনি!’

সেবার পদ্‌যাত্রার একমাসের মধ্যে, বাধ্য হয়ে কুড়ি কোটি মঞ্জুর করেছিল সরকার। কোলিয়ারিগুলোর মেশিন কেনার জন্য। কাঁচা কোক ধোওয়া জল নদীতে মিশত। জল নোংরা হত বলে পুরো এলাকায় দু বছর চাষ বন্ধ ছিল। তার জন্যই সেবার ‘পদ্‌যাত্রা’… জলমুক্তি। গ্রামের পর গ্রাম, হাজার হাজার চাষি হেঁটেছিল। পুলিশ এসে পালিয়ে গেছিল প্রথমে। কিন্তু কোনো মারামারি নেই, গুলি নেই, বোম নেই। বিষাণের কী নামডাক, খবরের কাগজে ছবি। সব শেষে মন্ত্রী পিঠ চাপড়ে ছিল। পরিমলই বলল,
‘লিডারজি, এই সংগঠন রেখে দিতে হবে পরযাবরনণের জন্য, আবার লড়াই-এর জন্য।’

তাই হল, ‘জলমুক্তি’ নামেই সংগঠনের কাজ শুরু হল। পশ্চিম থেকে পুবে ছড়িয়ে গেল বিষাণের কাজ। নীচের দিকের চাষীদের অনেক দিনের দাবি, ডিভিসির বাঁধের পর থেকেই ‘দামোদর’জীর জল কমছে। আগের মত চাষের জন্য জল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার বর্ষায় জল ছাড়লেই বন্যা। কিছুদিনের মধ্যে ওপর থেকে নীচ সবজায়গায় আওয়াজ উঠল। ঐ বাঁধেই সর্বনাশ। তাই বাঁধ সরাতে হবে। ভাঙতে হবে বাঁধ। বাঁধ সরিয়ে ‘দামোদরজী’র মুক্তির জন্য আন্দোলন শুরু হল জোরপাল্লায়। বিষাণ তখন খুব ব্যস্ত। পাটনা-রাঁচী-কলকাতা-দিল্লি দৌড়োচ্ছে যখন তখন। বহুত বহুত মুশকিল একটা মাঙ। বিষাণ ভেবে নিয়েছিল শেষ অস্ত্র আবার ‘পদ্‌যাত্রা’ আবার জলমুক্তি; ‘দামোদরজী’র জন্য দরকারে আবার জীবন দিতে যাবে। আর দিনে দিনে আশাও বাড়ছিল বিষাণের। ওকে দেখার জন্য, ওর কথা শোনার জন্য লোক আসছিল সভাগুলোতে, পত্রকার বৈঠকে। সে যুগে টিভি ছিল বটে কিন্তু সব খবরের ছবি হত না। সভার শেষে একটাই ধরাবাঁধা প্রশ্ন থাকত,
‘আপনি?… সত্যি, সত্যি। সেই টিলার মাথা থেকে…’

ওদিকে দূর গ্রামে টিলার মাথায় গঙ্গা, সর কী করছে, টাউনে জলমুক্তির অফিসে কী হচ্ছে খবর নেবার সময় নেই। দুটো বছর বাইরে বাইরেই কেটে গেল। হঠাৎ খবর এল, টাউনের পুলিশ তাকে খুঁজছে। পাটনার এক উকিল পি আই এল করেছে। সাধারণ লোকের দানে, চাঁদায় ওঠা জলমুক্তির পাঁচ লাখ টাকার তহবিল তছরুপ করেছে, নেতা বিষাণ সিং। অ্যারেস্ট হল বিষাণ।
তারপর একদিন বেরিয়েও এল হাজত থেকে। কানাই মাহাতো ভাসা ভাসা সাক্ষী দিল। কিন্তু সারা টাউনে, পাটনায়, রাচীতে এমনকি ওর নিজের গ্রামে সেই টিলার মাথাতেও আলতায় লেখা পোস্টারে পোস্টারে ছয়লাপ;
‘দামোদর কো বেচকে খায়া/ বিষাণ ভায়া, বিষাণ ভায়া।’
খিস্তি, গালাগালি, জুতো ছোড়া… মুখ লুকিয়ে পালাল বিষাণ। সব একই খবরের কাগজ; তখন ব্যস্ত তহবিলের পাঁচ লাখের হিসেবে। এক মাঝরাতে জঙ্গলের বড় আমগাছটার মগডালে উঠেছিল বিষাণ। গামছার ফাঁশটা শক্ত করবে মনে পড়ল ‘সর’র মুখ। পারেনি, নেমে এসেছিল।

আবার মুখ মনে পড়ে। বারবার যমুনার মুখটা মনে পড়ে। যখন চলে এসেছিল বিষাণ তখন জ্বরে বেহুঁশ যমুনা। তাতেও লাল চোখদুটো খুলেছিল। বলেছিল বিষাণ,
‘চললম রে, দামোদরজীর চুঁড়েল ছাড়াইনতে। তু জলদি ঠিক হয়্যে যা…কেমন!’
একটা চুলের মত সরু হাসি ফুটেছিল রোগা শুকনো মুখটায়। চোখ বুজেছিল মেয়েটা। বিষাণের মনে পড়ছিল, সেই আগেরবারেও কেঁদেছিল একজন। ওর জন্যে নয়, চাষিদের জন্য। গঙ্গাপারের মেয়ে, ঘরে ফসল না এলে কেমন লাগে সে জানত। তাই বলেছিল—
‘চাষীদের বাঁচাও তুমি। বড় কষ্ট ওদের!’
বিষাণ ভাবত। এ কেমন মেয়ে! মিটিং করেনি, মিছিলে যায়নি তাও মানুষের জন্য এত দরদ! মাথা খারাপ আছে নিশ্চয়। গঙ্গা না বললেও সেবার বেরোত বিষাণ। তখন আন্দোলনই তার জীবন। কিন্তু আজ যখন যমুনা বলছে, বিষাণ বুঝেছে এই মায়া মিথ্যে না। এ মায়া, জল-মাটি-জঙ্গলে যারা থাকে তাদের রক্তে থাকে। তাই যমুনা কেঁদেছে, খায়নি, মাছেদের কষ্ট বোঝার জন্য লুকিয়ে ‘দামোদরজী’র জল খেয়ে মরতে বসেছে। প্রচন্ড রাগ হয় নিজের ওপর। কাদের ওপর রাগ করে সব ছেড়ে সে দূরে ছিল এতদিন, কেন ছিল? পাপ করেছে যেভাবেই হোক প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। কিন্তু পরিমল… সে যে, এখনও ফিরল না।
যে বলাইকাকা চোর বলেছিল তাকে ফোন করতে বলে সঞ্জয়কে আর কষ্ট দেয়নি বিষাণ। তবুও সঞ্জয় ‘পদযাত্রা’ ছেড়ে চলে যায়নি। পরিমল কোনো কথা না শুনে চলে গেল। যাওয়ার সময় বলল,
‘লিডারজি তুমি হাঁটতে থাক বটে! শেষ দেখ্যে ছাড়বো…আমি চললাম। যমুনাকে বাচাইনবো ঠিক…’। পাঁচদিন হয়ে গেল পরিমলের কোন খবর নেই।

(৬)
সেই বাঁধনা টিলা যেটা সেবারও ছিল শেষ পয়েন্ট তার এক কিলোমিটার আগে শেষ পনেরোজনকে তিনদিন ধরে আটকে রেখেছে। আশেপাশে তেমন কোনো গ্রাম নেই। খবরের কাগজের লোক নেই। কেউ জানতেও পারছে না, কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে! বিষাণ বুঝতে পারছে, এরা সময় নিচ্ছে। লোকজন যতটুকু নড়েচড়ে বসেছিল। তারা পুরোপুরি ঝিমিয়ে পড়ুক তারপর ওদেরকে চালান করে দেবে দূরে কোথাও। দু একজন ঘনিষ্ঠ বিষাণকে বলেছে, এম এল এ-বলাই মাহাতোর এত ঘনিষ্ঠ সঞ্জয়, সেও এখানে আটক। বিষাণের কাছে সঞ্জয়ের গল্পটা জলের মতই পরিস্কার। যতক্ষণ না, ‘দামোদরজী’র কাছ থেকে বিষাণ অনেক দূরে চলে যায়। ততক্ষণ সঞ্জয়ের প্রয়োজন। ভেতরে ভেতরে অনেকদিন পরে হেসে ওঠে বিষাণ। এরা তাকে ভোলেনি তাহলে। সেবারও তো আটকানোর কম চেষ্টা করেনি! ব্যারিকেড করে রেখেছিল, হাজার হাজার লোককে। কত লোভ দেখানো? শুধু অ্যারেস্ট করেনি। কিন্তু বাঁধনা টিলায় ওঠার সব রাস্তা আটকে রেখেছিল। শেষদিন রাতে ছোট মিটিং-এ, মিশ্রাজীর কথা তুলেছিল পরিমল। ঠিক হল, বিষান, পরিমল মোট পাঁচজন। ব্যারিকেড টপকে এগিয়ে যাবে। বাকিরা ব্যস্ত রাখবে পুলিশকে। ওরা এগিয়ে যাবে উপরে যতক্ষণ না ওদের দাবি মেনে ‘দামোদরজী’র মুক্তির ঘোষণা হয়! তাতেও যদি ওরা সাড়া না দেয় তাহলে শেষ পর্যন্ত…। যারা দেখবে তারা এরপর আর তাদের বেঁধে রাখা যাবে না। কোলিয়ারির বিষজল বেরোনো তখন বন্ধ হবেই। শেষ রাতে তারা চমকানো আকাশের নীচে শুয়ে বিষাণ আর পরিমল দুজনেই উসখুস করছিল।

‘আমি কিন্তু তোমার আগেই যাব লিডারজি দেখে নিও!’
না পরিমলের আগেই উঠেছিল বিষাণ। ব্যারিকেড টপকাতে গিয়েই পরিমলের দুটো থাইয়ের শিরায় টান ধরেছিল। তাও এগোচ্ছিল পরিমল আর উৎসাহ দিচ্ছিল বিষাণকে,
‘আগে বাঢ় লিডারজি…দামোদরজী কি কসম…আগে বাঢ়।’
বেতের ঢাল আর লাঠি নিয়ে উঠে আসছিল ওরা। পারবে কেন বিষাণের সাথে! পাহাড়ি গাঁয়ের টিকটিকি সে। সবার আগে টিলার মাথায় উঠেছিল। পরিমলের কী আনন্দ। কিন্তু ততক্ষণে ওরা ওকে ধরে ফেলে নীচে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরিমল চেঁচিয়েই যাচ্ছিল,
‘পুলিশ তুমনে যিতনা মারো।/ লিডার বিষাণ হ্যায় না ইয়ারো’,
‘জল জমিন জঙ্গল আপনা/ সছ্‌ দামোদর আপনা স্বপনা’,
‘জলমুক্তি জিন্দাবাদ…’

কে যেন ডাকছে? ধরমড় করে উঠে বসে বিষাণ। খোলা আকাশের নীচেই শুয়েছিল ও। সামনে তাকাতেই চোখে পড়ল ‘দামোদরজী’র সেই ধনুকের মত বাঁক। বাঁধনা টিলাটা ওর পাশে উঁচু, আকাশ শাল গাছ। সেই ভোরবেলা, লালচে-নীল আকাশ আর ঠান্ডা হাওয়ায় শিরশির করছিল বিষাণের সারা শরীর। কানে আসছিল টিলার নীচে মানুষের হৈচৈ আর ফিসফিসিয়ে একটা চিৎকার।
‘লিডারজি, এ লিডারজি…’
আরে এ তো পরিমলের গলা! অন্ধকার সইলে দেখতে পেল। সামনের ঝোপটার নীচে বসে আছে পরিমল।
‘লিডারজি, জেলা হাসপাতালেই পড়্যেছিল যমুনা। একে তাকে ধর‍্যে লিয়ে গেলম কলকাতায়। পুরোনো লোকজনদের ধর‍্যে মেডীকেলে ভর্তি করেছি। কিন্তুক উয়ার গতিক ভালো লয়। যাকিছু হয়্যে যেত্যে পার‍্যে! আসতম না। কিন্তু খবর পেলম তোমায় ইভাবে ধর‍্যেছে। তাই চল্যে এলম।’
‘আমায় তো ফির যেত্যে হবে পরিমল! কী মুখ দিখ্যাব ‘সর’ কে?’
‘খেপেছ্যো লিডারজি! জল-জঙ্গল-জমিন কে বাঁচাবে! কত মানুষ চেয়্যে আছে তুমার দিকে। তুমি জানো না বটেক!’
‘যমুনার কথা বারবার মনে লিচ্ছে রে ভাই…’
‘তুমার যমুনাই তো চাইছিল, পেত্নি ছাড়াইনতে!’’
‘কুনো রাস্তা লাই। দিখ…কটা মাত্র লোক। সিবার কত মানুষ ছিল। সব রেডি কর‍্যে রেখেছে। চালান কর‍্যে দেবে!’
‘লিডারজি…মিশ্রাজিকে ইয়াদ করো। কে তুমার সাথে আছে সেটা আসল কথা লয়। আসল কথা হল তুমি কী চাও…সিবারে আমরা জিতলম না?’
‘সিবারে অবস্থা ভাল হচ্ছিল রে দোস্ত, ইবারে…আমাদের বয়স হইছে, বুঢ়া হয়্যে যাইছি!’
‘না লিডারজি, অবস্থা খারাপ লয়। মিশ্রাজির কলকাতার চ্যেলা সুবিমল বাবুর কাছে গিছলম। উয়াকে বললম সব। সিও টিভিতে দেখেছিল কিছুটা। উ ব্যবস্থা কর‍্যে দিছে। কাল সক্কালবেলায়, সব থেকে বড় চ্যানেলের গাড়ি আসবে ইখানে। সেই সুযোগটা কাজ্যে লাগাইন্তে হব্যে। আমাদের ভোরভোর টিলার মাথায় উঠ্যে পড়তে হব্যে।’
‘কিন্তু যমুনা…’
‘তুমার ঘরের যমুনার কথাই ভাবল্যে। আমরা যদি না পারি, তাহলে কত যমুনা মরব্যে লিডারজি?’

(৭)
পুরোনো বিদ্যে ভোলেনি বিষাণ। চোখে ধুলে দিয়ে উঠে এসেছে একেবারে মাথায়। পরিমলও উঠছিল। কিন্তু কপাল খারাপ! এবার গুলি। খাকি বন্দুকের গুলি, ডান থাইয়ে ঢুকে গেল। গড়িয়ে পড়ে গেছে নীচে। তবুও চেঁচাচ্ছে এখনও। সূর্য ওঠেনি আজ। আকাশে ছাইছাই মেঘ। আর দাঁড়ানোর কোনো মানে হয় না। বড় চ্যানেলের গাড়ি সত্যি এসেছিল। কিন্তু ওরা নামার আগেই বলাই-এর লাল আলো এসে গেল। ফিরে চলে গেল চ্যানেল। এখানে কোন বড় গাছ নেই। তাই পাখির ডাক নেই। সব থেক বড় ন্যাড়া পাথরটার ওপরে উঠে দাঁড়ায় বিষাণ। খুব ইচ্ছা করছে গঙ্গাকে, ‘সর’কে, যমুনাকে একবার দেখতে।

‘দিদ্দি দিখ্যে যা, সত্যি সত্যি ‘দামোদরজী’র পেত্নি ছাড়াইন্তে জলমুক্তি করছি। দিখ্যে যা, পালালম না। বন্দুক লিয়ে উয়ারা উঠে আসছে ওপরে। আর সময় লেই রে। সিবার উয়ারা জাল ছড়িয়ে লুফে লিয়েছিল। ইবার গুলি করবেক। করুক গা। সামনে চল্যে আসছে উয়ারা…ভাল থাকিস দিদ্দি। তোর মাছেদের সাথ্যে দামদরজীর শুরু থেকে শেষ যাস কিন্তু…’

এই দ্বিতীয়বার পাখি হয়ে উড়ল বিষাণ। কিন্তু এবার আর ওর উড়ান থামছে না। প্রায় ন্যাড়া টিলাটার খাড়া দেয়ালের প্রতি পাথরের খাঁজে খাঁজে ঝুলে থাকা লতাদের শেকড়-বাকড়গুলো এই সাতসকালে ওকে উড়তে দেখে অবাকই হয়ে যাচ্ছে। ওপরের আকাশটা দূরে সরে যাচ্ছে। ‘দামোদরজী’ আরও কাছে চলে আসছে। তবে এবারও জাল পাতা আছে। প্রতি পলে আরো আরও কালো হয়ে ওঠা ঘোলা জলের কণারা অনেক আগেই হাতে হাত ধরে জাল বানিয়ে নিয়েছে। কখন নেমে আসবে বিষাণ সিং…জলের মুক্তি ঘটাবে সে। পরিমলের স্লোগান কিছুতেই থামছে না।

‘পুলিশ তুমনে যিতনা মারো।/ লিডার বিষাণ হ্যায় না ইয়ারো’,

‘জল জমিন জঙ্গল আপনা/ সছ্ দামোদর আপনা স্বপনা’

‘আপনা মুক্তি…জলমুক্তি…’

‘জলমুক্তি জিন্দাবাদ…’

পড়ুন.. রাজেশ ধর এর আরও গল্প

রাজেশ ধর এর গল্প “শেকল”
নদী একটাই ।। রাজেশ ধর
রাজেশ ধর এর গল্প- “চুপিকথা”

সংশ্লিষ্ট বিষয়