হামিদ কায়সার এর গল্প- ডুব

ডুব
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘কী রে জয়নাল, হইল?’

জয়নাল বলে, ‘হয় নাই।’

আটটা থেকে নয়টার এই সময়ে লোকে লোকে নাও ভইরা গেলেও হয় না জয়নালের, আয়নালেরও হয় না। লোক আরও চাই। আরও আরও লোক। লোকের ভেতরে লোক। লোকের উপরে লোক। যতভাবে ঠাসা যায়। লোকেরও যেন এসবে বিকার নাই। নয়টা সাড়ে নয়টার মধ্যে পৌঁছাতেই হবে টাউনে। কেউ খুলবে দোকান, কেউ করবে অফিস। ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের পোলাপানও কিছু আসে। আর থাকে কিছু আলগা মানুষ। যাদের কোনো কাম-কাজ নাই। খাইব ফিরব ঘুরব। এ অফিসে সে বাসায় ঢুঁ মারব। তবে, এ সময়ে যারা আসে তাদের কারোরই হুঁশজ্ঞান থাকে না, যেন দম ফেলার অবসর নাই। তারা অস্থির ভঙ্গিতে পিঁপড়ের মতো ছুটে আসে বুড়িগঙ্গার ঘাটে ঘাটে, এই ছোট কুশিয়ারাবাগে। ঝটপট উঠে পড়ে নাওয়ে। যেন নাওয়ে উঠলেই টাউনের হাওয়া! পৌঁছে গেল ওপার।

কম দিন তো দেখল না আয়নাল, দেশ স্বাধীনের পর পরই এসে ভিড়েছে এই বুড়িগঙ্গার নীড়ে। দশ-এগারো যখন বয়স, ক্ষুধার কষ্টে বাড়ি ছাড়ছিল। ক্ষুধার কষ্টেই তো। নুলা বাপটা রোজগার করতে পারত না। মা মাইনষের বাড়ি কাম কইরা, চাইয়া-চিন্তা যা আনত, তা দিয়াই চলত সংসার। সে টাকায় কী আর পাঁচটা মাইনষের পেট চলে? পেট না চললে মেজাজও চলে না। খেঁচাখেঁচি লাইগাই থাকত সব সময়। অসহ্য হইয়া একদিন খালি একটা ছেঁড়া গেঞ্জি আর লুঙি পইরা জন্মের মতো কুমিল্লার চান্দলা ছাড়ল। পকেটে টাকা ছিল না ঠিকই, কিন্তু বুকের মধ্যে কইত্তে যে সাহস আইসা ভর করছিল, তারই জোরে উইঠা পড়ছিল ঢাকার ট্রেনে। ভাড়া দিতে পারে নাই বইলা গলাধাক্কাও খাইছে। সেই গলাধাক্কা খাওয়ার সময়ই ট্রেনের মধ্যে আলাপ-পরিচয় হইল জৈনদ্দিন চাচার সঙ্গে। কাঁচা-পাকা চুলদাঁড়িঅলা মানুষটা জিজ্ঞাসা করল, ‘আমার লগে ঢাকা শহরে নাও বাইতে পারবি?’

কথাটা শুনে প্রথমে একটু অবাকই হয়েছিল। টাউনের মধ্যে আবার নৌকা চলেনি? সেই প্রস্তাবটারেই তখন মনে হইছিল বড় একটা আশ্রয়! সেই যে আইসা বুড়িগঙ্গায় জীবনটারে ভাসাইয়া দিল, হাল ধরল বৈঠার- তারপর কত পানি গড়াইছে। টলটলা পানি ঘোলা হইছে। দোকানপাট, কল-কারখানায় নদীর তীর ভইরা গেছে। নদীর সীমানা কমতে কমতে ওর চিকন চুলে পাক ধরল- বুড়িগঙ্গা থেইকা জীবন আর উদ্ধার পাইল না। জৈনদ্দিন চাচার হাত ধইরা সেই যে নাও বাওয়ার শুরু, তারপর নিজেই একদিন নাও লইল, সে নাওয়ের রোজগারে বিয়া করল, সংসার পাতল, পোলা হইল মাইয়া হইল, জয়নাল আর মায়রে টাউনে আনল- সেই নাওয়ের মায়া আজও কাটাইতে পারল না। দুই আড়াই বছর হইল শ্যালো নৌকা নিছে, নিলে কী অইব ইঞ্জিনের নৌকার সঙ্গে ভাবটা এখনো ওর ঠিক জমে নাই।

কেমনে জমব? শ্যালোরে তো অর নৌকাই মনে হয় না। মনে হয় একটা লঞ্চ কী জাহাজ! পরথম পরথম ভটভটি শুনলেই তো মেজাজটা চইড়া যাইত আয়নালের। লইছে খালি জয়নালের পীড়াপীড়িতে। রিকশার নৌকা চালাইতে জয়নালের আর ইচ্ছা করতাছিল না। নয়া কালের পোলাপান! ইঞ্জিনের নৌকা চালাইব। চালাও! চাইর-পাঁচ বছরের মধ্যেই বলে আমিরাবাগে জমি কিনন যাইব। কিনো! অর সঙ্গে তাল ধইরাই তো শ্যালো নিল। নিলে কী অইবো, কই আপনা পোলা আর কই মাইয়ার জামাই! ভাত দিব ঠিকই, সঙ্গে খোঁটা দিতেও ছাড়ব না! একটা দুইটা খরচ! মবিল কিনো ডিজেল কিনো। আলগা একজন মানুষ রাখো। হের খায়-খরচ! খাজনার চাইতে বাজনা বেশি! রোজগার হয় আর কয় টাকা! তারপরও অবশ্য খারাপ না। আয়-রোজগার তো ভালই হইতেছিল, এতগুলান মাইনষের পেট! খরচের কি শেষ আছে! মাসে মাসে এক শ দুই শ জমানোও হইতাছে! খারাপ কী! এইভাবে দিন চললেই হইল! শুনতাছে ইঞ্জিন নৌকারও বলে দফরফা। ইকোরিয়ার ব্রিজের পর বাবুবাজারেও ব্রিজ হইব। শুনতাছে কী, নিজের চোখেই তো দেখতাছে, ইঞ্জিনিয়ারগো কত কায়-কারবার! পানির মধ্যে আইসা এইটা মাপে সেইটা দেখে। ব্রিজ হওয়ার বলে আর দেরি নাই। সেই ব্রিজ হইলে কি আর প্যাসেঞ্জার হইব! মাঝিগো মইধ্যে কত রকমের ফিসফাস। আয়নালের এইসব নিয়া চিন্তা নাই। যেমন কইরা দিনের পর দিন মানুষ বাড়তাছে, ব্রিজ দিয়া কয়জন পারাইব? হ্যান্ডেলটা অভ্যাসমতো একবার মোচড় মেরে ও আওয়াজ দিয়ে উঠল, ‘কী রে জয়নাল! হইল?’

জয়নাল বলে, ‘হয় নাই।’

এত সহজে হয় না জয়নালের। ভিক্ষা কইরা মা ভাত খাওয়াইছে, কত দিন না খাইয়া ঘুমাইয়া পড়ছে। খিদায় এখন পেট জ্বলে না ঠিকই, অন্তর জ্বলে। সেই খিদা আর কষ্টের কথা মনে হইলে ধিকিধিকি কইরা অন্তর জ্বলে। সেই পোড়া অন্তর বোঝে খালি টাকা। যেমন কইরাই হোক, টাকা লও। কাইচা কাইচা টাকা লইয়া পকেটে ভরো। পঁচিশ বছরে বড় ভাই যা করবার পারে নাই, সাত বছরেই তা করবার চায় জয়নাল। তাই ভাইয়ের ওপর মাঝে মাঝে ওর মেজাজটা বিগড়াইয়া যায়। এই পঁচিশ বছরে হেয় করছেটা কী! খালি এই পার থেইকা ওই পার, ওই পার থেইকা এই পার। নিজে যে একটা নাও কিনব তাও পারে নাই। কোশার মতো ছোট্ট একটা নাও লইয়া থোম্বার মতো খালি খাইলা খাইলা বইসা থাকত, তাও নিজের না পরের নাও। হের পরে কত মাঝি আইয়া শ্যালো ইঞ্জিনের নৌকা জুটাইয়া আমিরাবাগে জমি কিনল, কেরানীগঞ্জের বুকে নিজের বাড়ি বানাইল! বড় ভাই রইয়া গেছে অহনও সেই আবেদ ব্যাপারীর বস্তিতে।

মুরাদ হয় নাইক্কা নিজের একটা ঠিকানা জোটানোর। কেমনে হইব? রিক্সার নাওয়ের এক ক্ষেপেই তো  অর্ধেক দিন পার। তারপর আবার যা ভাড়া! এক ক্ষেপে দশ টাকা উঠতেই টানাটানি। রোজগার নাই অথচ খরচ ডাবল ডাবল! ঘাটে ঘাটে দিতে হয় খাজনা। গায়গতরে খাটতে হয় বইলা খিদাও লাগে বেশি। জয়নাল শুধু আয়নালকে রিকশার নাও ছাড়িয়ে ইঞ্জিনের নৌকাই ধরাল না, লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায় দেখে সাহস করে একদিন বলে ফেলল, ‘এইভাবে তো সারা জীবন কিছু করতে পারবা না ভাই।’

আয়নালও যে কথাটা বুঝত না, তা না। বুঝলেও কি করার আছে! কিচ্ছু নাই। অসহায়ের মতো ভাইয়ের কাছেই জানতে চাইল, ‘তাইলে কী করুম ক?’ তখনই স্বপ্নের কথাটা উচ্চারণ করল জয়নাল, ‘একটা ইঞ্জিনের নৌকা কিনা লও।’

‘ইঞ্জিনের নৌকা কি মুখের কথা? অত টাকা পামু কই?’ তখনই বুদ্ধিটা দিয়েছিল জয়নাল, ‘ভাই আমরা তো দেশ ছাইড়া আইসাই পড়ছি। চান্দলার ওই ভিটা রাইখা লাভটা কী? ওইটা বেইচা ফালাইলেই তো ইঞ্জিনের নাও হইয়া যায়!’

জয়নালের বুদ্ধিটা খারাপ লাগে নাই আয়নালের। কিন্তু ওইটুকুই তো ঠিকানা! বেচতে কি মন সায় দেয়? মরলে পরে কব্বরের জায়গা কই? খড়ের চালার ছোট্ট বারান্দায় নুলা বাপটা পাটি বিছাইয়া শুইয়া থাকত! সেই মানুষটা বাইচা থাকলে কি আর মায়রে কামরাঙির চরের এই বস্তিতে আইনা রাখবার পারত! কত রকমের চিন্তা হইছিল- মা যদি শহরে না থাকবার চায়? যদি মন তার না বসে?

জয়নাল ওকে প্রায় প্রত্যেক দিনই বুঝিয়েছে, পত্তি টিপে যদি জনপত্তি তিন টাকা হয়, চল্লিশজন মানুষ উঠলে তিন চল্লিশে একশো বিশ টাকা। দিনে যদি দশটা ক্ষেপ মারো দশ এক শ বিশে বারো শ টাকা। খাজনা, খরচটরচ সব বাদ দিলেও পত্যেক দিন তিন চাইর শ টাকা থাকব! আর যদি চল্লিশজনের জায়গায় পঞ্চাশজন উঠাও, লাভ রাখনের তো জায়গাই পাইবা না। এক দুই বছরের মধ্যেই আমিরাবাগে জায়গা রাখতে পারবা!

আজ থেকে দুই-আড়াই বছর আগের কথা, জয়নালের চল্লিশজন মানুষের হিসেব শুনেই মন গলে গিয়েছিল। পঞ্চাশজনের কথা শুনে মনে জ্বলে উঠল লাল নীল সবুজ স্বপ্নের বাতি। এরে জিগায়, ওরে ধরে, নানানভাবে শ্যালো নৌকার খোঁজ-খবর নেয়। সত্যিই দেখে, দিনেই হাজার-বারো শ টাকা কামাই করা সম্ভব।

দুই ভাই মিলে দেশের বাড়িতে গিয়ে ভিটাবাড়িটা বেচে এসেছে পাশের বাড়ির সাইবুদ্দিনের কাছে। গ্রাম দেশের বাড়ি, তার মধ্যে বর্ডারের কাছে! কত আর টাকা! তিন কাঠা জমির দাম পনেরো হাজার পেয়েছিল। সেটা দিয়ে আর কিছু নিজের জমানো টাকা যোগ করে এই ইঞ্জিন নৌকাটা কিনে ফেলল। তারপর থেকে মাশাল্লাহ! আয়-রোজগার ভালোই। যেমন বলেছিল জয়নাল সে রকমই রোজগার। তাই আমিরাবাগে জমি কেনার স্বপ্নটা আরও মজবুত হয়েছে। আমিরাবাগে তো না, আরেকটু ভিতরে, খোলাপাড়ার দিকে। জমি দেখেও এসেছে। তিন-চার কাঠার মতো! এতদিনে কেনা হয়েই যেত। মাঝখানে বড় মেয়েটার হইল টিউমার। চিকিৎসা করতে গিয়া অনেকগুলো টাকা একমুঠে খরচ হয়ে গেল। তারপর থেকেই মনমর্জি বদলাইয়া গেছে আয়নালের। যত লোকসান হইছে জীবনের তার দ্বিগুণ যেন উশুল করতে হইব। তাই উঠারে কাদিরা যত পারস! জয়নালের সায় ছাড়া যেমন এক পাও বাড়ায় না, ওর আওয়াজ ছাড়া কখনো নৌকাও ছাড়ে না। ভিড়ের ভিতর থেকে হঠাৎ কে একজন বলে উঠল, ‘ওই মিয়া নৌকা ছাড়েইন না কেলা? মানুষ কি মাথায় ঊঠব?’

কথাটা শুনেও না-শোনার ভান করল আয়নাল। আমল দিতে চায় না। মাইনষের কথায় কান দিলে কি আর খোলাপাড়ায় জমি কিনন যাইব? ও তাকায় আসমানের দিকে। সকাল থেকেই আসমানের নচ্ছমটা আজ ভালো না। টাউইনা মাইয়াগো মতো খালি রান দেহাইবার তালে আছে। বৃষ্টি যে আজ হবে না, তা নিয়ে ও বাজি ধরতে রাজি। আজ কদিন ধরেই দেখছে আসমানের এই উড়–ক ঝরুক তামাশা। আসার জন্য বেশ সাজুগুজু করে মেঘ। কিন্তু বাতাসের দৌড়ানি খাইলেই পাল্টি মাইরা আন্দামিন্দি কই যে দৌড়, টিকিটাও খুইজা পাওন যায় না। আল্লায় দিলে দুই তিন ঘণ্টা পরেই দেখা যাইব, রইদের আলোয় বুড়িগঙ্গার গাল ঝিলিক মারতাছে।

‘ওই মিয়া কথা কানে ঢুকবার লয় নাই? নাও ছাড়বা? না অন্য নৌকায় যামু?’ সেই এক গলা! এতগুলা মাইনষের মধ্যে কোনখানকার কোন নবাব খাঞ্জা খার নাতি আইছে। তার হুকুমমতো চলতে হইব। মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যায় ওর, ধমকে ওঠে, ‘চুপ কইরা বইয়া থাকেন মিয়া। নাও আপনার হুকুমে ছাড়–ম?’

কথাটা বলে ফেলেই আয়নাল বুঝল ডোজটা বেশি হয়ে গেছে। কিন্তু ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে চিল্লাপাল্লা। একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠল কয়েকটা গলা, ‘অই, হাতপা ভাইঙা কইলাম বুড়িগঙ্গায় ফালাইয়া দিমু! এক ঘণ্টা ধইরা বসাইয়া রাখছে, দেখছেননি কারবার? হালার পোর সাহস কত ! চ্যাটাং চ্যাটাং কথা কয়!’

অশ্লীল গালও ভেসে উঠল একটা-দুইটা।

গতিক বেশি সুবিধের নয় বুঝতে পেরে আয়নাল হাঁক দিয়ে উঠল, ‘কী রে জয়নাল হইল?’

জয়নাল বলে, ‘হইছে!’

জয়নাল জানে কখন হয়। ও এই ঝাঁজ এই উত্তাপটার আশাতেই বসে থাকে। প্যাসেঞ্জারের ধৈর্য যতক্ষণ, ততক্ষণ পর্যন্ত ধরো তক্তা মারো প্যারেক! প্যাসেঞ্জার গরম হইলেই, নাও ছাড়ো! মানে মানে কেটে পড়ো!

নোঙর ছাড়িয়ে ধাক্কা মেরে নৌকায় উঠতে উঠতে জয়নাল আওয়াজ দেয়, ‘করিম! স্টার্ট দে!’ করিম তখনও তৈরি না। পিলপিলে সারি থেকে নিজেদের নৌকাটাকে বের করে আনতে আশপাশের নৌকা ঠেলছিল ও। খোলা জায়গায় আসতেই করিম দৌড়ে এসে ইঞ্জিনে স্টার্ট দেয়। অমনি ভটভট শব্দ করতে করতে নৌকাটা বুড়িগঙ্গার জলভেজা নির্জনতার গালে ঠাস ঠাস চড় মারতে মারতে টাউনমুখী ঘুরতে থাকে। বৈঠার হ্যান্ডেল নিপুণ ভঙ্গিতে ঘুরিয়ে চলেছে আয়নাল। বুড়িগঙ্গার অলস ঢেউয়ের দোলায় দোলায় ইঞ্জিনের চাকাটা ধীরে ধীরে সরব হয়ে ওঠে আর নৌকাটা ভট ভট করতে করতে সামনের দিকে ছুটে চলে।

মানুষগুলা ঠাণ্ডা! কেউ কেউ ঝাপসা শহরের দিকে তাকায়। শহর আজ ততটা স্পষ্ট নয়। আর একটু গেলেই ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকবে। তাছাড়া আকাশ মেঘলা বলে সবকিছু কেমন ছায়া-ছায়া। অন্ধকার-অন্ধকার। ভটভটি-আওয়াজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয়নাল আপন মনেই গর্জে ওঠল, ‘কী রে জয়নাল, ভাড়া তুলুইস না কিয়ারে?’

ভাইয়ের ওপর মেজাজটা খিঁচে যায় জয়নালের। তোমারে কেন নিত্য নিত্য ভাড়া নিয়া চিল্লাইতে হইব? ভাড়ার চিন্তা কি আমার চাইতে তোমার বেশি? নাও ছাড়ার পর কি কোনোদিনও ভাড়া তুলতে এক মিনিট দেরি হয়, না হইছে? নাও চলে, ভাড়া আদায়ও চলে পাল্লা দিয়ে। প্যাসেঞ্জারের কাছ থেকে চিপড়িয়ে চিপড়িয়ে ভাড়া তোলে ও। তার পরও হুকুমদারের হুকুম কোনোদিনও থামে নাই। এ যেন অভ্যাসই আয়নালের। নাও চলা শুরু করলেই, ও বলবেই বলবে, ‘ভাড়া তুলুইস না কিয়ারে?’

মেজাজ সামাল দিয়ে জয়নাল ভাড়া তোলায় মনোযোগী হয়। কী যে ভেজাইলা কাম এই ভাড়া তোলা! সেইটা কি আর নৌকার গলুইয়ে আরামে খাড়াইয়া থাকলে বুঝন যায়? একতিল দাঁড়াবার জায়গা নাই কোনোখানে, সেখানে ও কীভাবে নৌকার এক ধার থেকে আরেক ধারে যায়? ভিড়ের চিপাচুপা দিয়া ঢুকতে গেলেই একজন যদি ফোঁস কইরা উঠে তো, আরেকজন মারে গোঁতা! আর মাইয়া মানুষ থাকলে তো ধারেকাছে ভিড়নটাই মুশকিল! ইজ্জতের মামলা! মুশকিল কি খালি এক জায়গায়! একবারের বেশি কারো কাছে ভাড়া দুই বার চাইলেই হইল, কেমন কইরা যে খ্যাঁক মাইরা ওঠে একেকজন! সব সময়ই কি খেয়াল রাখন যায়, কার কাছ থেইকা ভাড়া নিছে আর কার কাছ থেইকা নেয় নাই। মানুষও তো আইজকালকার, না চাইলে কি সাইধা সাইধা কখনো ভাড়া দেয়? অথচ বড় ভাই গপপো করে, আগে বলে প্যাসেঞ্জাররাই ভাড়া তুইলা হের হাতে ধরাইয়া দিত। ‘ওই মাঙ্গের পো! চোখে দেখস না? ধাক্কা মারস ক্যা?’ হঠাৎ খামোখা খামোখা গালি শুনে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল জয়নালের। ও ফেরাই ধরে উঠল, ‘মুখ খারাপ করেন ক্যা? আপনারে ধাক্কা মারছি?’ অন্য আরেকজন মাঝখানে কায় আঙুল ঢোকায়, ‘ধাক্কা না লাগলে এমনেই চিল্লায়? এত মানুষ উঠাস ক্যা, অ্যা? হাঁটনের জাগা রাখস না!’

কথা বাড়ায় না জয়নাল, কথা বাড়াতে গেলে ভাড়া সব তোলা হবে না। এসব ওর গা সহা। প্রতিদিনই এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে যেতে ওর জানটা বার হওয়ার জোগাড় হয়। কারো কাঁধের গুঁতো খেতে হয়, কারো পা মাড়াতে হয়, কারো ডিঙাতে হয় মাথা- খাতিরজামা যাওয়ার জোঁ নাই।

ভিড় শুধু নৌকায় নয়, নদীতেও। আজকাল সব সময়ই সতর্ক থাকতে হয় আয়নালকে। নৌকায় ভরে গেছে বুড়িগঙ্গা। খালি কি নৌকা? ট্রলার, ড্রেজার, লঞ্চ, ইস্টিমার। একটার পর একটা আছেই। এই ভরা বর্ষায়ও একতিল ফাঁকা জায়গা নাই। বর্ষায় নদীর সাইজ বাড়ছে ঠিকই, নৌকাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। বর্ষা মৌসুমে বুড়িগঙ্গার মুখের সব খাল খুলে যাওয়ায় সেই পনেরো মাইল বিশ মাইল দূরের আবদুল্লাহপুর, রাজাবাড়ি, শাক্তা, রামেরকান্দা, বাঘাশুর, কোনাখোলা, খোলামোড়া থেকেও শয়ে শয়ে নৌকার বহর আসতে থাকে এ সময়টায়। বেলা যত বাড়ে, বুড়িগঙ্গার ঢেউও বেড়ে যায়। বেড়ে যায় জঞ্জাল। নাও চালিয়ে আর আগের মতো সুখ নাই। বাহাত্তর সালে ও যখন আইল- আহারে! কী সুন্দর টলটলা ছিল বুড়িগঙ্গার পানি! যেমন ছিল আয়তন, তেমন ছিল সুরত। বক, মাছরাঙারা কিচিরমিচির করত। ভরা চৈত্র মাসেও নদীর এপার থেইকা ওপার দেখা যাইত না। নাও ছিল হাতেগোনা। মুখও ছিল সব চেনা চেনা। এখন তো মানুষের অথই পাথারে বুড়িগঙ্গার পানি হাবুডুবু খায়।

দেখতে দেখতে চোখের সামনে কেমন বদলাইয়া গেল অভাগী। ধীরে ধীরে শুকিয়ে কেমন আমচি হয়ে গেল। একদিন বেঢপ ফোঁড়ার মতো মাঝখানে জেগে উঠল কামরাঙির চর। কুলে কুলে গড়ে উঠল কত ঘরবাড়ি কল-কারখানা। বুড়িগঙ্গার পানি আজলায় লইলেই এখন বমি আসে। খাওন তো দূরের কথা। শীতকালে গন্ধে টিকনই যায় না! তারপর কত হুমকি ধামকি অত্যাচার। ঘাটে ঘাটে খাজনাদার। আয় বাড়ছে রোজগার বাড়ছে। রিকশা ছাইড়া শ্যালো নিছে! লাভটা কী? যেমন বাড়ছে খরচ, তেমন বাড়ছে ক্যাওয়াজ!

নৌকাটা এখন কোনাকোনি মাঝনদী পেরিয়ে কামরাঙিরচরের কাছ দিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছে। কালো মেঘের ছায়ায় শহরের চৌকোনা বাক্সগুলো সব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শহরের দরদালানগুলোকে ওর চৌকানা বাক্স বলেই মনে হয়। ওসবের ভেতর যে মানুষ কেমনে থাকে! ভেবে ভেবে এক এক সময় কুল পায় না। মানুষগুলোকে জানেও না তেমন। যাওয়া-আসা করলে তো! ঘাট পর্যন্তই ওর দৌড়! শহরের এত কাছে থেকেও ও শহর দেখেনি। দেখার মধ্যে কেবল মিটফোর্ড। আসমার যখন টিউমার হলো বেশ কয়েকদিন দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। মানুষগুলারে বেশি ভালা লাগে নাই ওর। কেমন জানি চোখা চোখা কথা কয়। মনের মধ্যে কারো রস-কষ নাই। হঠাৎ কথা নাই বার্তা নাই, একেবারে সামনের লোকটা গা মোচড়াতে মোচড়াতে দাঁড়িয়ে পড়ল। পুরা দুনিয়া আন্ধার হয়ে গেল আয়নালের। সামনে কী আছে না আছে, না দেখলে নৌকার হাল ধরব ক্যামনে? ও গলাটা নরম করেই বলল, ‘ভাই বসেন। আমারে তো কানা কইরা দিলেন!’

লোকটার গলায় শ্লেষ ঝরে পড়ল, ‘মিয়া মাঞ্জা রাখার জায়গা নাই। তুমি কও বসতে। মানুষ ওঠানোর সময় তাল পাও না?’

মেজাজ সামলে মুখের মধ্যে চিনি-হাসি ফুটিয়ে ও বলল, ‘আপনারাই তো উঠেন। আমরা না উঠাইলে দোকান খুলবেন ক্যামতে!’

‘দোকানের চিন্তা তোমারে করতে হইব না মিয়া। নিজের চিন্তা করো!’ বলতে বলতে লোকটা চুপচাপ বসে পড়ল।

কেরানীগঞ্জে আর কেরানীগঞ্জের মানুষ নাই। আচার-আচরণ নচ্ছমেই বোঝা যায়। আগে লোকজন আসত বুড়িগঙ্গা আর ধলেশ্বরী পাড়ের জিনজিরা, আবদুল্লাপুর, রাজাবাড়ি, শাক্তা, রামেরকান্দা, বাঘাশুর, কোনাখোলা, রুহিতপুরের। আর এখন সারা বাংলাদেশের মানুষ আইসা ভাইঙা পড়ছে জিনজিরায়। টাউনে আইসা মাল কামায়, জিনজিরার টিনের ঘরে উইঠা পয়সা বাঁচায়। লঞ্চটা কি উপরে উঠাইয়া দিব নাকি। একই দিক থেকে একটা লঞ্চ তুমুল ঢেউয়ের আলোড়ন তুলে মস্তানি করতে করতে এগিয়ে আসছে। মস্তানিই তো। নিজের মতো কইরা পথ চলছে বেটায়। কেউ সাইড দিলে দিবা, না দিলে উপর দিয়াই যামু- এমন একটা ভাব। আয়নাল স্টিয়ারিংটা ডান দিকে ঘুরিয়ে দেয়।

ভাড়া তুলতে তুলতে জয়নালও মাঝনৌকা পেরিয়ে ভাইয়ের প্রায় কাছাকাছি চলে আসে। শেষজনের হাত থেকে ভাড়াটা উঠিয়ে, দুই হাত মেলে দিয়ে বড় ভাইকে টাকার অংকটা চটপট দেখিয়ে নেয়। এটা না দেখলে শান্তি হয় না আয়নালের। আগে আগে চোখ ইশারা দিতে হতো। এখন জয়নাল কাণ্ডটা  নিজের থেকেই করে, এক রকম অভ্যাসই হয়ে গেছে ওর। টাকা দেখে রোজকার মতোই অতৃপ্তির একটা মেঘের ছায়া খেলে যায় ওর মুখের ওপর দিয়ে। কোনোদিনও টাকা দেখে জুত লাগে না ওর। মাইনষের যত মাথা দেখা যায়, টাকার তত মাথা কই?

ভাইকে দেখিয়েই ঝটপট টাকাটা জয়নাল কাপড়ের একটা থলের মধ্যে ভরে আণ্ডারওয়্যারের ভিতরে চালান করল। ঘাটের কাছাকাছি এসে গেছে নাও। এই এক ভেজাল! এ সময়ে সোয়ারিঘাটে নাও ভিড়ানোর এক ইঞ্চি জায়গা খালি থাকে না। মুরব্বি টাইপের এক লোক হঠাৎ আওয়াজ দিয়ে উঠল, ‘এই জায়গায় তো নাও ভিড়াইতে পারবি না রে কাদিরা। রাজারঘাটে যা।’

ঘাটের অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে আরও দশজন লুফে নিল কথাটা। ‘এই জায়গায় টাইম নষ্ট করার দরকার নাই। রাজারঘাটে যা!’

সোয়ারিঘাটের অবস্থা সত্যিই খারাপ! যতই সামনের দিকে যায় অস্থির হয়ে ওঠে আয়নাল। নৌকা যে কোথাও ভিড়াবে তিল পরিমাণ জায়গা নাই। কোনো একটা ফাঁক- ফোকড়ও দেখা যায় না। অন্য নৌকায় যে যাত্রীদের নামিয়ে দেবে, সে আশা করনটাও বোকামি। নৌকায় নৌকায় সোয়ারিঘাটই তো হাওয়া।

হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দিল ও। রাজারঘাটে যাওনটাই বুদ্ধিমানের কাজ। সব মাঝি অহনো রাজারঘাটের খোঁজ পায় নাই। সবাই ব্যস্ত সোয়ারিঘাট নিয়া। চুপচাপ রাজারঘাটে ট্রিপটা নামাইয়া দিয়া সোয়ারিঘাটে আইসা সিরিয়াল ধরলেই হইল! তা না হইলে আধাঘণ্টা-একঘণ্টা বইসা থাকন লাগব!

রাজারঘাটমুখী হতেই জয়নাল এগিয়ে যায় সামনের গলুইয়ের দিকে, করিম ইঞ্জিনের পাশে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু রাজারঘাটের দিকে তাকিয়েই চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় আয়নালের। খাইছে! এ যে দেখি সোয়ারিঘাটের সাইঝা ভাই! তাইলে রাজারঘাটের খোঁজ পাইছে সব হালায়! নৌকাটারে ও ঢুকাইব কোনখান দিয়া? সোয়ারিঘাটে তবু ঘাট আছে, সিঁড়ি আছে। এই জায়গায় তো তাও নাই। কাঁঠের একটা ঘাট কোনমতো বাঁধা। তাছাড়া ভরা বর্ষার ঢল-ঢল পানিতে টানের সব ফাঁকা জায়গা পানির তলে।

ও যখন রাস্তা খুঁজে বেড়াচ্ছে তখনই ইঞ্জিন বন্ধ করল করিম। নৌকার গতি ধীরে ধীরে কমে আসে। নৌকাটা গিয়ে বেশ পেছনের দিকের নৌকার সারির পেছনে ঠাঁই নেয়। ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে উশপাশ, ‘কিয়ারে নাওটা এই জায়গায় আনল? এইটা কি কোন ঘাট হইল?’ আরেকজনও সায় দিল সঙ্গে সঙ্গে, ‘সোয়ারিঘাটে ভিড়াইলেই পারত!’ এমনিতেই ভিতরে ভিতরে অস্থির ছিল আয়নাল, প্যাসেঞ্জারের কথা শুনে মেজাজ চড়ে গেল ওর। তরাই কইলি রাজারঘাটে যা! তরাই কস সোয়ারিঘাট ছাড়লা ক্যা? মেজাজ সামলে নিল ও। সবার মেজাজই বিগড়ে আছে। অফিস দোকান খোলার সময় চইলা যায়, ও ভিতরে ভিতরে বুদ্ধি খোঁজে, নৌকাটা কোথাও ভেড়ানো যায় কিনা! এক ইঞ্জি জায়গাও ফাঁকা পায় না। ছোট্ট একটা ঘাট, পঙ্গপালের মতো মানুষ, দোকান, টংঘর। এই ঘাটেও কোনো আশা নাই।

এদিকে ঘাটফিরতি নৌকাগুলোও বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আয়নালদের নৌকাটাকে সরে যেতে বলছে! কোনদিকে যাবে আয়নাল! মাথাটা খারাপ হয়ে যাবার জো হয় ওর। একদল প্যাসেঞ্জার সুর উঠায়, ‘অই বেটা! রাজারঘাট কোনো ঘাট হইল! বালুঘাটে যা!’ কারো কথায় কান দেয় না আয়নাল। চুপচাপ বসে থাকে। কিন্তু প্যাসেঞ্জারদের অস্থিরতা বাড়ে। বালুঘাটের দাবিটা জোরালো হয়ে উঠে। ‘অই কতক্ষণ বইয়া থাকবি। বালুঘাটে যা।’

অন্য যাত্রীরাও সায় দেয়, বালুঘাট ছাড়া নাও ভিড়াইতে পারব না।

আয়নাল কী করবে ভেবে পায় না। একবার ভাবল, যাই! বালুঘাটেই যাই। কাছেই তো। কয় মিনিটের পথ? আবার ভাবল, বালুঘাটের অবস্থাও যদি একই রকম হয়? খামাখা খামাখা সময় নষ্ট। ও রাজারঘাটের দিকে তাকিয়ে হাঁ করে হ্যান্ডেল হাতে দাঁড়িয়ে রইল। তখনই আকাশটা ওর নচ্ছম দেখাতে শুরু করে। হাওয়া ওঠে। থম ধরা কালো মেঘ ভাঁজ খুলতে খুলতে ছড়িয়ে পড়ে। প্যাসেঞ্জারদের অসহিষ্ণুতা বেড়ে যায়। একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে অনেকজন, ‘এহেনে বইয়া বইয়া কি মিয়া কলার চোক্লা খাইবা? কইতাছি না বালুঘাটে যাও?’

মনে মনে আয়নালও অনেক আগেই এ ঘাটে নাও ভিড়ানোর আশা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু সাহস পাচ্ছিল না। কে আবার কোন কথা বলে ফেলে! প্যাসেঞ্জারের যা মক্কর। ও কারোর অপেক্ষায় থাকে না। খামাখা এক বেইল নষ্ট! ও হাঁক দিয়ে উঠল, ‘করিম! স্টার্ট দে!’ ওর গলার আওয়াজ শুনেই জয়নাল নৌকাটা ভিড় থেকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে বাইরের দিকে বের করে আনে। হ্যান্ডেল ঘোরাতে ঘোরাতে আয়নাল নৌকাটাকে বালুঘাটের দিকে মুখ করতেই করিম ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। ভটভট আওয়াজের মধ্যেও ভেসে ওঠে কার যেন গাল, ‘হালার পো হালারা ঘাটটারে এক্কেবারে খানকিপাড়া বানাইয়া ফালাইছে।’

গাল শুনে আয়নালের মুখে হাসি খেলে যায়। খানকিপাড়ায় ও কোনোদিন যায় নাই। তাই সেখানকার ভিড় কেমন হয় ও জানে না। যেই ভিড়ে হাঁটন যায় না, দম বন্ধ হইয়া যায়, সেই ভিড়ে যে ক্যানো মানুষ ভিড় জমায়! সেইটা কিছুতেই মাথায় ধরে না। আজকাল বুড়িগঙ্গায় ওর অস্থির লাগে! মাঝে মাঝে দমটা বন্ধ হইয়া আসে। চার-পাঁচ বছর আগেও অভাগীর ওপর এতটা চাপ ছিল না। স্বাধীনমতো নৌকা নিয়া যেখানে খুশি ঘুরত, ইচ্ছামতো ভিড়াইত। বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে সুখ-দুঃখের দুইটা কথা কইত। সেই সুখটুকুও আজ আর নাই। ঘাটের পর ঘাট হইছে, তাও নৌকা রাখনের জায়গা হয় না। ক্যাওয়াজের ওপর ক্যাওয়াজ তো আছেই!

বালুঘাটের কাছাকাছি হতেই কয়েকজন প্যাসেঞ্জার আওয়াজ তুলল, ‘এই ঘাটেও ভিড়াইতে পারবা না মাঝি, সোজা বাদামতলী যাও।’ কথাগুলি কি ঠাট্টা, না সত্যি সত্যি বলছে, ঠাহর করার আগেই ফুঁসে উঠল আরেক দল, ‘আই রাখো! নামলে বালুঘাটেই নামুম আমরা! খেলা পাইছ নাকি মিয়া?’

‘আমারে কন ক্যা? আমার কী? আমারে যে ঘাটে কইবেন, সে ঘাটেই ভিড়ামু!’ মেজাজ আর কিছুতেই সামলে রাখতে পারল না আয়নাল। চেঁচিয়ে ওঠল, ‘করিম!’

ডাক শুনেই করিম ইঞ্জিনের স্টার্ট বন্ধ করে দেয়। ধীরে ধীরে নৌকার গতি কমে আসে। নৌকার জঙ্গলের দিকে ভিড়তে থাকে ওটা। ‘সোয়ারিঘাটে নামনই ভালো ছিল!’ কেউ একজন প্রাজ্ঞের মতো বলে উঠল। আরেকজন টিটকারি মেরে উঠল, ‘তাইলে আবার সোয়ারিঘাট যাই।’ হেসে উঠল কয়েকজন।

‘হাইসেন না। হাইসেন না। বালুঘাটের অবস্থা দেখছেন! সোয়ারিঘাটেই ফিরতে হইব!’

তারচাইতে কোশেরবাগেই যাওন ভালো!

আবার হাসির ধুম উঠল।

ধমকে ওঠল একজন, ‘মিয়াগো ডিউটিফিউটি নাই। সারা দিন বুড়িগঙ্গার মধ্যেই তাফালিং করবার চায়? অ্যা? পৌনে দশটা বাজে। কোনো হোদাল নাই?’ লোকটার ক্ষোভ অস্থিরতা মুহূর্তেই সংক্রমিত হয়।

‘ধুৎ! সোয়ারিঘাটেই নামাটা ভালো ছিল!’

‘অবস্থাটা দেখছেন? বালুঘাটের তো একটা বালুকণাও দেখা যায় না। নৌকা ভিড়ব কেমতে?’

বালুঘাটের দিকে তাকিয়ে আয়নালের মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে ওঠে। এইভাবে যদি এক বেলা খালি ঘাটে ঘাটে ঘুরতেই সময় পার হয়, খাজনার টাকাই তো উঠব না। যেমন কইরা হোক দঙ্গলের মধ্যেই ঘাটে ঢোকার জায়গাটা বের করতে হইব। ‘ওই টান। করিম। ভিতরে ঢুকাইয়া দে!’ বলল তো বটে। নৌকা ঢোকানোর জায়গা কোথায়। তবু জয়নাল, করিম দুই দিক থেকে অন্য নৌকা ঠেলেঠুলে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু কখন যে ঘাটে ভেড়াতে পারবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। বালুঘাটের সিমেন্ট বাঁধানো ছোট্ট ঘাটটার কোনো অস্তিত্বই চোখে পড়ছে না। ওদিকে একদল মানুষ নৌকা থেকে নামার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে। ‘দশটা পরাই বাইজা যায়? কতক্ষণ মাঞ্জারে নৌকার পাটাতনের কাছে বন্ধক দিয়া বইসা থাকব?’ একদল এবার সত্যি সত্যি সুর উঠাল, ‘বাদামতলীর ঘাট ছাড়া কোন উপায় নাই! এক-দুই ঘণ্টা এইখানে বইসা থাকতে হইব!’

‘অই মিয়া আগে কইবেন না?’

‘আগেইতো কইছিলাম! বালুঘাটে কোনো বোদাই ছাড়া নয়টা-দশটার সময় কেউ আসে? বাজব না বারোটা! বেটা মাঝি! চৌদ্দজনের কথা শুইনা নৌকা চালায়! সোয়ারিঘাটের নৌকা সোয়ারিঘাটে ভিড়াবি! রাজারঘাট! বালুরঘাট! যা বেটা এইবার বাদামতলী!’

‘বাদামতলী ছাড়া উপায় নাই। বড় ঘাট। এই রকম এক শ দুই শ নৌকা রাখলেও মনে করেন অসুবিধা নাই।’

আস্তে আস্তে বাদামতলীর প্রতি জনসমর্থন বাড়ে। কিন্তু আকাশের অবস্থা দেখে বাদামতলীর কথাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলল আয়নাল। বাতাসের বেগ বাড়ছে। করিম আর জয়নাল যেভাবে এ-নৌকা সে-নৌকা ঠেলেঠুলে আগাচ্ছে, দেখাই যাক না কত দূর যাওয়া যায়! বেশ কতকটা দূর আগায়ও ওরা। এগিয়ে গিয়ে আবার আটকে থাকে। দশ মিনিটের মতো গড়িয়ে যায়। লোকজন অস্থির হয়ে ওঠে, ‘মাঝির পো মাঝি কইলাম না বাদামতলী যাও! এইহানে অক্কা মাইরা বইসা থাকবা?’

সঙ্গে সঙ্গেই আরেক প্যাসেঞ্জার ফুঁসে উঠল, ‘সারা বেলা এই-ই করব! আজকে আর নামন লাগব না। আগের কন্ঠটার ফোঁসফোসানি, ‘হ থাকুক বইয়া!’

তখনই পাশের নৌকা থেকে লোকজন জয়নালের দিকে তাকিয়ে জানতে চায়, ‘বাদামতলীত যাইবা?’

জয়নাল অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, ‘দেহি প্যাসেঞ্জার কি কয়?’

বেশ কয়েকজন পাশের নৌকার যাত্রী একসঙ্গে বলে উঠল, ‘গেলে আমগো নামাইয়া দিয়ো। ভাড়া দিমুনে! দেহো না এহেনে বইয়া বইয়া আঙুল চুষতাছি!’

‘আইছেন কইত্তে?’ জয়নাল জানতে চায়।

‘বামনশুর!’ পাশের নৌকার যাত্রীরা জানাল।

জয়নাল কী বলতে যাচ্ছিল একজন ধমকে ওঠল, ‘ধুর মিয়া! খাইজুরা প্যাঁচাল বাদ দেও। নৌকা কি করবা করো!’

জয়নাল চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ভাবলেশহীন। আয়নালও দিশেহারা। মূর্তির মতো হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাদামতলীর গ্রুপ রীতিমতো শোরগোল তোলে, ‘বাদামতলী যাইবা? না এহেনে বইয়া-বইয়া তামশা দেখবা?’

যেন সবার সমর্থন আদায় করার জন্যই আয়নাল আপন মনে বলে উঠল, ‘বাদামতলী যাওয়াটাই তো ভালা মনে হইতাছে।’

‘যাও যাও! অখ্খুনি যাও! বইসা থাইকো না!’

‘ওই বাদামতলীরে জয়নাল!’ বলে হাঁক দিয়েই আয়নাল নৌকা পেছনের দিকে নিতে তৎপর হয়ে উঠল। তখনই নৌকার বিদ্রোহী একটা গ্রুপ হঠাৎ ধড়ফড় করে দাঁড়িয়ে যায়, ‘দাঁড়াও! আমাদেরকে এখানেই নামিয়ে দেও।’ বলল তো বটে, কিন্তু লোকগুলো কোথায় নামবে, কারোরই ঠিক মাথায় আসে না।

বালুঘাটের কোনো খোঁজ নাই। নৌকার পর নৌকা আতিলা পাতিলা রাখা। সব নৌকাই ঠেলেঠুলে ঢুকতে চাইছে। কোনো নৌকা গলার ফাঁস খোলার মতো বেরিয়ে আসতে চাইছে। নৌকার পর নৌকায় পার হওয়ার আশা নিয়ে দশ-বারোজন ডাঁটে অন্য একটা নৌকায় নেমে গেল। চার-পাঁচজন নামতে গিয়েও নামল না। ‘বালুঘাটে আর পৌঁছাতে হবে না।’ মন্তব্য একজনের। ঠেলা আছে। রণে ভঙ্গ দিয়ে থেকে গেল ওরা। অনিশ্চয়তার পথে গা ভাসানোর সাহস পেল না। ‘বাদামতলীই যাও!’ পিছুটান গ্রুপের একজন জোরে চেঁচিয়ে ওঠল মাঝির উদ্দেশে। ত্রিশ-চল্লিশজন যারা বসেছিল, তারা তাড়া দিয়ে উঠল, ‘মাঝি দেরি করো না। যাও। বাদামতলী যাও!’

আয়নাল, জয়নাল, করিম নৌকাটাকে বাইরের দিকে বের করতে যখন তৎপর হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা। পাশের অপেক্ষমান নৌকা থেকে একদল লোক হুড়মুড় করে লাফিয়ে লাফিয়ে আয়নালের নৌকায় উঠতে লাগল। আগের যাত্রীরা কেউ ভয়ে কেউ বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে ওঠল, ‘অ্যাই অ্যাই! আবার প্যাসেঞ্জার ভরস ক্যান? নৌকা তো ডুইবা যাইব!’

জয়নালের অসহায় ভঙ্গি, ‘কী করুম ভাই! একলা একলাই তো উঠতাছে!’

নতুন যাত্রীরা একে ঠেলে, ওকে সরিয়ে জায়গা নিতে লাগল। দুই একজন অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, ‘উপায় নাই ভাই। ওই নৌকার মাঝি হালায় পুটকির মধ্যে আইকা লাগাইয়া বইছে, নড়বার চায়। কত বোঝাইলাম, বাদমতলী যা! খবর নাই।’ আরেকজন দোসরও জুটল, ‘কতক্ষণের রাস্তা ভাই! পাঁচ মিনিটের! সবাই মিলা-মিশা একটু কষ্ট করি আর কি!’

পুরনো যাত্রীদের কারো কারো সন্দেহ হয়, কাণ্ডটা জয়নালেরই কিনা! ওতো সামনেই বসেছিল। তলে তলে হয় তো যাত্রী ঠিক করেছে! ভিতরের সন্দেহকে একজন আর চেপে রাখতে পারল না। গাল পেড়ে উঠল, ‘তোগো হালায় পেট ভরে না। নাও যহন ডুবব। বুঝবা নে!’

ব্যস! ক্ষোভ উসকে উঠল। কেউ কেউ অতি উত্তেজিত হয়ে জয়নালের দাঁত পর্যন্ত ভেঙে দিতে চাইল। আয়নাল চুপচাপ। বাদামতলীতে তো নৌকা এমনেই যাইব। চাইট্টা প্যাসেঞ্জার যদি উঠেই, তাতে কার বাপের কী ক্ষতি হইছে- বিষয়টা ঠিক ওর মাথায়  খেলে না। এই যে চরকির মতো এক ঘাটেরতে আরেক ঘাটে ঘুরাইতাছ, ক্যান আমগো কষ্ট হয় না? দুইটা প্যাসেঞ্জার নিছে দেইখা এত গরম! মনে মনে খুশিই হয় আয়নাল, ভাইডা তার মাশাল্লাহ টাডি আছে! কে কী বকল না-বকল কারো কথাই কানে নেয় না। ও একা থাকলে কি এই রকম তিতভুরুঙির কাণ্ড করতে পারত? পারত না। প্যাসেঞ্জার কি আরও আছে না এখনই ছাড়বে, বুঝতে পারে না আয়নাল। ও আপন মনেই হাঁক দিয়ে উঠল, ‘কিরে জয়নাল হইল?’

জয়নাল বলল, ‘হইছে।’

না হয়ে কি উপায় আছে! নৌকার মধ্যে আর একটা পিঁপড়ে ধরারও জায়গা নাই। যত মানুষ নেমেছে, তারচে তিনগুণ মানুষ উঠেছে। নৌকার অবস্থা টালমাটাল। নৌকাটা যেন এক হাত বসে গেছে। অন্য নৌকায় পা রাখতে রাখতে করিম ইঞ্জিনের দিকে এগোয়। জয়নাল অন্য নৌকা ঠেলতে ঠেলতে ওদের নৌকাটাকে খোলামেলা জায়গায় বের করে আনে।

দেখতে দেখতেই নৌকাটা ভিড়ের দঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে। ইঞ্জিনের শব্দের আগেই শোনা যায় জয়নালের গলা, ‘এই যে ভাই, বালুঘাট থেইকা কে ওঠছেন? ভাড়া! ভাড়াটা দেন!’ ভাড়া তুলুইছ না কিয়ারে বলতে গিয়েও দাঁতে দাঁতে চেপে ব্রেক কষল আয়নাল। হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দিল মাঝ-নদীর দিকে।

ভাড়া তোলাটা বেশ কঠিনই হয়ে গেল জয়নালের জন্য। এক তিল জায়গা নাই যে, একে ওকে সরিয়ে পথ করে যাবে! তাছাড়া পুরনো যাত্রীরা ক্ষেপে রয়েছে। জয়নাল নৌকোর কিনার ঘেঁষে ঘেঁষে এগোয়, একটু এগোয় আর ভাড়া তোলে। বাদামতলী তত বেশি দূরে নয়। আয়নাল আগের চেয়ে বেশি সতর্ক। নৌকা চালাতে হচ্ছে সাবধানে। এখান থেকেই শুরু সদরঘাটের হাওয়া- লঞ্চ, জাহাজ, কার্গোর রাজত্ব। ওদিকে বাতাসের বেগ আরও বেড়ে যায়। কখন নিকষ কালো হয়ে উঠেছে বুড়িগঙ্গার জল। সেদিকে তাকিয়ে অনাহুতই নিচের ঠোঁটটা কামড়ায় আয়নাল। তখনই একটা শোরগোল ওঠে, ‘মাঝি মাঝি! তোমার হেলপার তো পইড়া গেল গা!’

‘কেউগা পড়ল! করিম!’ শালার এমন ভটভট আওয়াজ! আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ! কে পড়ল না পড়ল, বোঝার উপায় নাই। সামনের দিকে তাকিয়ে ওর বুকটা ধ্বক করে উঠল, করিম তো সামনেই! জয়নাল? জয়নাল কই! ‘ওই হালায় ইঞ্জিনটা বন্ধ কর!’ করিমের দিকে তাকিয়ে ও চিৎকার করে উঠল।

ততক্ষণে নৌকা অনেক দূর চলে গিয়েছে। হ্যান্ডেল ঘোরাতে ঘোরাতে আয়নাল চেঁচিয়ে উঠল, ‘জয়নাল, কই রে জয়নাল?’ করিমের গলাটা বুজে আসে, ‘জয়নাল ভাই তো পইড়া গেছে গা!’

‘কই পড়ল? নাম! নাম!’

                করিম কি আর নামে? তাছাড়া নামবেই বা কোথায়? একে তো নৌকা অনেক দূরে চলে এসেছে। অন্যদিকে আকাশে মেঘের তাণ্ডব, কালি-বুড়িগঙ্গার ঢেউ আজ উত্তাল। ও পেছনের দিকে হাত দিয়ে দেখায়, ওই যে ওই জায়গায় পড়ছে! প্যাসেঞ্জাররাও সেই একই জায়গা দেখাল। চটজলদি সে-দিকে নৌকা ঘুরিয়ে আয়নাল ধমকে উঠল, ‘ইঞ্জিন স্টার্ট দে!’

নৌকা ছুটে চলে। ধীরে ধীরে সে জায়গাটার কাছে যায়। কিন্তু পানিতে কোনো মানুষ কিংবা প্রাণীর অস্তিত্ব চোখে পড়ে না। কারোরই চোখে না।

আয়নাল পাগলের মতো নৌকাটা এদিকে ওদিকে ঘোরাতে ঘোরাতে জয়নালকে খুঁজতে থাকে। সাঁতার তো জয়নাল ভালোই জানে! কামরাঙির চরে যখন নতুন নতুন আইল, সারা দিনই তো বুড়িগঙ্গায় সাঁতার কাটত! সাঁতরাইতে সাঁতরাইতে ভাই তার কত দূর চইলা যাইত। সেই ভাইয়ের তো জলে ভাইসা থাকার কথা! জয়নালরে জয়নাল! তুই কই? ‘জয়নাল? জয়নাল?’ ডাকতে ডাকতে গলা ভেঙে আসে ওর।

জয়নালের কোনো সাড়া নাই। জলের কোনো শব্দ নাই। জল বোবা। জল নিধুয়া পাথার। ‘ইঞ্জিনটা বন্ধ কর করিম! নৌকাটারে থামা।’

করিম ইঞ্জিন বন্ধ করে। কিন্তু নৌকা থামে না। ঢেউয়ের তোড়ে তোড়ে নৌকা ভেসে যায়। সরে যায় দূরে। জলের দিকে চোখ রাখতে রাখতে আয়নাল হ্যান্ডেল ঘোরায়। নৌকাটাকে বয়ে নেয় উল্টো স্রোতে। জলের মধ্যে কাউকে চোখে পড়ে না। কাউকে সাঁতার কাটতে দেখা যায় না। এবার বুকটা সত্যিই ভেঙে আসে। অজানা আশংকায় ও কাঁপতে থাকে। যাত্রীরা এতক্ষণে হই চই চিৎকার জুড়ে দেয়। ‘কী শুরু করছো মাঝি? আমগো নামাইয়া দেও।’

চিৎকার করে ওঠে আয়নাল, ‘ওই মিয়ারা মায়ের পেটের ভাইরে বুড়িগঙ্গায় ফালাইয়া যামু?’

‘তোমার ভাইরে তুমি কই খুঁজো মিয়া? পড়ছে কই, নৌকা কই? আজাইরা খালি খুঁজলেই হইল, দমকল বাহিনীরে খবর দেও!’

‘খবর দিতে দিতে…’ আয়নাল আর কিছুই ভাবতে পারে না। প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে তর্ক করতেও ইচ্ছে করে না। হ্যান্ডেল দিয়ে নৌকাটাকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে যেতে ও পাগলের মতো নিজের মাথা আছড়ায়। ‘হায় হায়! আমার মায়রে আমি কী কমু? কী সুন্দর ভাইটা আমার ছিলরে… নিজের হাতে পাইলা-লাইলা বড় করছিরে…?’

কাউকে কাউকে বুঝি ওর বুকচেরা কান্না স্পর্শও করে। একজন মুরব্বি এসে ওর হাতটা ধরে সান্তনার সুরে বলল, ‘দেখোগা, তোমার ভাই কোন নৌকায় উইঠা বইসা রইছে! তুমি মিয়া হুদাই-হুদাই কানতাছ! আমগো নামাইয়া দিয়া যত ইচ্ছা খুঁইজো! তোমার ভাইয়ের কিচ্ছু হয় নাই!’

মৃদু একটা আশার আলো জ্বলে ওঠে আয়নালের মনে, লোকটির কথা শোনে! হতেও তো পারে। জয়নাল অন্য কোনো নাওয়ে উইঠা বইসা রইছে! বুড়িগঙ্গার বুকের মধ্যে কত নাও! কত ঘর! একটা ঘরে কি আর অর আশ্রয় হবে না? পরমুহূর্তেই মুরব্বি লোকটাকে ওর স্বার্থপর মনে হয়। নিজে নামার লইগা মিথ্যা সান্তনা দিচ্ছে! তখনই বলবান একজন পৌঢ় এসে ওর গলা টিপে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘একজনরে তো বুড়িগঙ্গায় ফালাইছস? আমগোরেও মারবি?’

আয়নাল হতভম্ব হয়ে বলল, ‘মারতে চাই? মারতে চামু ক্যান? আমার যে কী সর্বনাশটা হইল দেখবেন না, দেখবেন না আপনেরা?’

‘কী দেখুম? নিজেগো লাশ? ওই হালা, তর নাও কই যায়, তাল আছে?’

এতক্ষণে হুঁশ হয় আয়নালের। সত্যিই তো আবোল-তাবোল কোথায় খুঁজে বেড়াচ্ছে ও। বাতাসের তোড়ে নৌকা বাদামতলীর সীমানা ছাড়িয়ে প্রচণ্ডবেগে ছুটে চলেছে সদরঘাটের দিকে। কী ভেবে ও চেঁচিয়ে ওঠল, ‘স্টার্ট দে! ইঞ্জিন স্টার্ট দে করিম!’

স্টার্ট দিতে গিয়ে করিম ব্যর্থ হয়। বারবার ব্যর্থ হয়। ‘স্টার্ট তো হয় না ওস্তাদ!’

‘হইব না ক্যা? স্টার্ট দে!’ বাতাসের তীব্র বেগে ওর কথা হারিয়ে যায়।

‘স্টার্ট তো হয় না ওস্তাদ!’

‘স্টার্ট হইব না ক্যা? জোরে টান। জোরে জোরে।’

‘স্টার্ট তো হয় না ওস্তাদ!’

বাতাসের তোড়। যাত্রীদের চিৎকার-চেঁচামেচি। নৌকাটা প্রচণ্ডবেগে ছুটে চলেছে একটা ভাসমান কার্গোর দিকে। অস্থির হয়ে ওঠে আয়নাল। হ্যান্ডেল ছেড়ে নিজেই ছুটে যায় ইঞ্জিনের কাছে! ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়, হয় না। নিজের সব শক্তি উজাড় করে হ্যান্ডেলটাকে টেনে ধরে ও। স্টার্ট হয় না। প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতে এক সময় হাঁপিয়ে ওঠে। হাঁপাতে হাঁপাতেই লোকজন ঠেলেঠুলে নৌকার একেবারে কিনারায় গিয়ে দাঁড়ায়। মুহূর্তেই ঝপ করে একটা শব্দ হয়। বাতাসে এক ঝলকের জন্য শোনা যায়, ‘কিরে জয়নাল হইল?’

জয়নালের সাড়া নাই!

গল্পের পটভূমি: ২০০১ সাল


হামিদ কায়সার : কথাসাহিত্যিক, ঢাকা।

আরও পড়তে পারেন…..
মহানন্দার ডাকে ।। হামিদ কায়সার
আমার শৈশব নদী ।। হামিদ কায়সার

সংশ্লিষ্ট বিষয়