অস্তিত্ব- নুসরাত সুলতানা

অস্তিত্ব- নুসরাত সুলতানা

গল্প 

আনিস সাহেব ড্রাইভারকে হাঁক দিয়ে বলেন তার বিএমডাব্লিউ গাড়িটা বের করতে। আজ তিনি জমি দেখতে যাবেন। তার অন্তত পনের বিশ বিঘা জমি দরকার একসাথে। একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি বানাবেন। দামী গাড়ি নিয়ে গেলে হাউজিং সোসাইটির লোকজন নড়ে-চড়ে বসে। টাকা কিছু বেশি নেয় নিক। জমি পেলে তিনি একটা মনের মতো বাড়ি করবেন। ছোট একটা পুকুর বানাবেন। তাতে পদ্ম ফোটাবেন। পাড়ে কিছু দেবদারু, ইউক্যালিপটাস আর থুজা গাছ লাগাবেন। পুকুরের চারপাশে বসার ব্যবস্থা করবেন তিনি। করবেন ছোট একটা দেশীয় সবজির বাগান। ছেলে-বউ, মেয়ে-জামাইরা আয়েশ করে থাকবে দেশে এসে। এছাড়াও ব্যাংক, তিনটা গার্মেন্টস, বেশকিছু জমি, গরুর খামার অনেককিছুই তো আছে।

আফসার উদ্দিন, মানে আনিস সাহেবের দাদা ছিলেন এনবিআর এর পিয়ন। তিনি গ্রামে বেশ ভালো সম্পদ বানিয়েছিলেন। আর আনিস সাহেবের বাবা মিলন সাহেব ছিলেন সাহেব ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। মিলন সাহেব কোটি টাকার সম্পদ বানিয়েছেন। আর বাকিটা ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত করে, ঋণ খেলাপি করে ষোলকলা পূর্ণ করেছেন আনিস সাহেব।

আনিস সাহেব বসিলা পার হয়ে যেয়ে থামেন সাভার হেমায়েতপুরে থেকে সাত কিলোমিটার দূরে আলীপুর গ্রামে। স্কাই লিভিং হাউজিং সোসাইটি আনিস সাহেবকে খুব শ্রদ্ধা ভরে অভ্যর্থনা জানায়। জমির লে আউট দেখায়। মোট ষাট বিঘা হাউজিং প্রোজেক্ট এর বিশ বিঘা জমি আনিস সাহেব নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। স্কাই লিভিং এর এমডি আনিস সাহেবকে র‍্যাডিসন রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ করান। পাঁচ ফিট, পাঁচ ইঞ্চি আনিস সাহেবের চেহারায় বেশ স্বস্তি আর আনন্দ ফুটে ওঠে। খেতে খেতে তিনি স্কাই লিভিং এর এমডিকে জিজ্ঞেস করেন, শুনেছি বছর পঞ্চাশ আগে নাকি এখানে একটা খরস্রোতা নদী ছিল তা পরিবেশের লোকজন ঝামেলা করবে না তো? এমডি সাহেব হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেন; আরেএ নদী দখল শুরু হয়েছিল সেই আশির দশকেই। তখন এরশাদের মন্ত্রী ছিলেন করিম সাহেব। একটু একটু করে তিনি নদী দখল করে করে এই হাউজিং করছিলেন। এরপর এরশাদের পতন হলে তিনি পরবর্তী সরকারি দলেও যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মারা গেলে তার ছেলেরা আমাদের স্যারের কাছে এই হাউজিং বিক্রি করে কানাডা চলে গেছেন। ছোট একটা খাল ছিল সেটা আমরা ধীরে ধীরে ভরাট করে ফেলেছি। আর স্থানীয় লোকজন কে লাম-ছাম টাকা পয়সা দিয়ে স্যার উৎখাত করে দিয়েছেন। অই ছোট লোকেরা আর কী করবে? এই বলে দুইজন পঞ্চাশোর্ধ মানুষ বিকট হাসি হাসেন

ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে আনিস সাহেব বাসায় ফেরেন। বাসায় ফিরেই তিনি রিনাকে লেবু আর পুদিনা পাতার শরবত দিতে বলেন। ইদানীং মনে মনে একটু আফসোস ও হয়; রিনাকে দেখলেই পার্সোনাল সেক্রেটারির কথা মনে পড়ে। কি লম্বা আর কাট কাট ফিগার! খুবই লক্ষী মেয়েটা। আনিস সাহেবের মাথা টিপে দেয়াসহ সব আবদারেরই যত্ন করে। হঠাৎ মনে পড়ে মিতুর মায়ের আজকে থেরাপি দেয়ার তারিখ। টাকা চেয়েছিল মেয়েটা। আনিস সাহেব বলেওছিলেন একাউন্টস অফিসারকে। নাহ মিতুকে একটা ফোন দিতে হবে।

এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে রিনা আসে শরবত নিয়ে। আনিস সাহেব স্ত্রীকে বসান যত্ন করে। তারপর দেখায় স্কাইলিভিং এর ব্রশিওর। দেখায় যে তিনি বিশ বিঘা জমি বুকিং দিয়ে এসেছেন তিনি। রিনার চোখে আনন্দ ঝিলিক মারে। স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে রিনা বলেন, এতদিনে একটা কাজের কাজ করেছ। আমি মহিলাক্লাবে মুখ দেখাতে পারছিলাম না একটা বাংলো বাড়ি নেই বলে। আনন্দে তিনি আর্কিটেক্ট কন্যা সুবাকে  হোয়াটসঅ্যাপে কল  দিয়ে বলেন, তোর বাবা হেমায়েতপুরে বাগান বাড়ি বানাবে। বিশ বিঘা জমি বুকিং দিয়ে এসেছে। সুবা বলে মা আমি দেশে থাকলে বাবার দুই গালে দুইটা চুমু দিতাম। আমি শিবলীকে বলতেই পারছিলাম না যে আমাদের কোনো বাগান বাড়ি নেই। কারণ ওদের দুটো বাগান বাড়ি টাঙ্গাইল আর গাজীপুরে। এই বাড়ির ডিজাইন আমি নিজেই করে পাঠাব। রিনা তৃপ্তির হাসি হেসে বলে করিস মা।

বেশ জোরেশোরে এগিয়ে চলছে স্কাইলিভিং হাউজিং প্রজেক্ট। প্রজেক্টের মালিক মনির সাহেব এরই মধ্যে শুরু করেছেন সরকারি দলের লেজুড়বৃত্তি।প্রজেক্ট এর সবাই খুব নিশ্চিত এবং খুশি জমির ক্রেতারাও। কারণ মনির সাহেব বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্স এর সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সম্ভাবনা আছে পরবর্তীতে এম.পি ইলেকশন করার। হাউজিং এ রাখা হয়েছে মসজিদ, কিন্ডারগার্টেন, স্পা সেন্টার, স্পেশাল বাচ্চাদের টেককেয়ার সেন্টার, আরও অনেককিছু।

খুব জমজমাট ভাবে এগিয়ে চলছে স্কাই লিভিং হাউজিং প্রজেক্ট এর উন্নতি ও কর্মযজ্ঞ। রাজধানীর যেসব মধ্যবিত্ত প্রাণপণে মধ্যবিত্ত থেকে নাম কাটিয়ে উচ্চবিত্তে নাম লেখাতে চান; তদের অনেকেই গ্রামের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে জমি কিনেছেন স্কাই লিভিং হাউজিংএ। যারা কিনতে পারেননি তাদের আফসোস অন্তহীন।

প্রায়শই যখন পাজারো, করলা, আর বিএমডাব্লিউ গাড়ি এসে থামে তখন আশি বছর বয়স্ক অমলকান্তির বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে আসে একটা অস্ফুট শব্দ;

আহা ফুলঝুরি! সত্তুর বছরের জীর্ণ শীর্ণ ভিক্ষুক শেফালী প্রায়ই বুক চাপড়ে বলেন; আমার ভিটেমাটি সব নিছিস তোদের ভালো হবে না।

পাঁচ বছরের ভেতর স্কাই লিভিং এক চমৎকার স্যাটেলাইট শহরে পরিনত হয়েছে। কি নেই সেখানে; স্পা সেন্টার, কমিউনিটি সেন্টার, কিন্ডার গার্টেন, শপিং মল। আছে অত্যাধুনিক বেশ্যালয় ও। অনেক মেয়েরাই নিরাপদে চালিয়ে যাচ্ছে দেহ ব্যবসা।

আনিস সাহেব বিশ বিঘা জমিতে বানিয়েছেন মনোরম এক বাংলো বাড়ি। নাম দিয়েছেন জলকন্যা। একটা ছোট হৃদ করে তাতে পদ্ম ছেড়েছেন। হৃদের চারপাশে লাগিয়েছেন নারকেল আর পাম গাছ। চারিপাশ ঘিরে আছে বসার ব্যবস্থা। বাচ্চাদের খেলার জন্য করেছেন ছোট একটা খেলার পার্ক।

স্কাই লিভিং এর অধিবাসীরা বেশ ভালো জীবন যাপন করছেন। অনেক ব্যবাসা প্রতিষ্ঠান তাদের অফিস খুলতে চাচ্ছে স্কাই লিভিং এ। আসতে চাচ্ছে নামকরা দুটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্কাই লিভিং এর আশেপাশে।

এক গভীর রাতে স্কাই লিভিং এর নারী, শিশু, পুরুষরা যার যার জীবনের নিয়মিত আয়োজনে ব্যাস্ত; কেউ বেঘোরে ঘুমাচ্ছেন, কেউ সিনেমা দেখছেন কেউ সম্ভোগ করছেন বেশ্যালয়ে নারী শরীর। কোনো কোনো বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা আছেন তাহাজ্জুদ নামাজের সিজদায়। ঠিক তখনই প্রচন্ডভাবে কেঁপে ওঠে স্কাই লিভিং। শুরু হয় তুমুল ভূমিকম্প। চুর চুর করে ধসে পড়তে থাকে নয়নাভিরাম প্রাসাদগুলো। আনিস সাহেবের হৃদে শুরু হয়েছে সমুদ্রের ঢেউ। মাত্র দেড় ঘন্টায় প্রায় চল্লিশ বিঘা জমি পরিনত হয় এক খরস্রোতা নদীতে।

পরিবেশবিদ এবং ভূতত্ববিদরা বলছেন; প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে স্কাই লিভিং এর স্থানে ছিল খরস্রোতা ফুলঝুরি নদী। সেই নদী পাঁচ দশকে দখল হয়ে হাউজিং হলেও ফুলঝুরির তলেই ছিল হয়তো বা ভূগর্ভস্থ নদী। যেখানে শুরু হয় সুনামি আর নদীর মুখেই ছিল হ্রদ হয়তো বা। পরিবেশবিদরা বলছেন প্রকৃতির চেয়ে বেশি অস্তিত্ববান আর কেউ নেই। সভ্যতা কখনো প্রকৃতির সাথে জুলুম করে টিকতে পারে না।

সব মানুষ যখন কষ্টে আহাজারি করছে অমলকান্তি আর শেফালী বেগম তখন প্রশান্তির হাসি হেসে বলেন, ফুলঝুরি ফিইরা আইছে। তারা তখন পা ভেজাচ্ছেন ফুলঝুরির জলে।

আরও পড়ুন….

ব্রহ্মপুত্র নদ না নদী?

নদ, না নদী- শেখ রোকন

সংশ্লিষ্ট বিষয়