বানের পানি চোখের জল একাকার!

নৌ-দুর্ঘটনা

মো.ইউসুফ আলী ।। দেশে একদিকে করোনা আরেক দিকে বন্যা। আবার এসেছে ঈদ। সাধারন খেটে খাওয়া মানুষের কাজকর্ম স্থবির। কি করবে মানুষ! কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? কোথায় মিলবে ঠাঁই? এসব হিসেব মিলাতে দিশেহারা আজ দেশবাসী।

করোনা আক্রান্তে কাপঁছে দেশ। প্রতিদিন হাসপাতাল গুলেতে বাড়ছে করোনা রোগির সংখ্যা। এ মহামারি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। অতিরিক্ত রোগিতে কাহিল ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী আজ পর্যন্ত সারাদেশে আক্রান্ত রোগীর সংখ্য একলক্ষ একাশি হাজার একশ উনত্রিশ জন। মৃত্যু হয়েছে অন্তত দুই হাজার তিনশ পাঁচ জনের। তবে সরকারি হিসেব এমনটা হলেও সারাদেশে বাসাবাড়িতে করোনা আক্রান্ত রোগির সংখ্যা আরো বেশি। তাই বিষয়টি নিয়ে যথারীতি আতঙ্কিত দেশবাসী। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরও রয়েছে কঠিন চাপে।

শতর্কতা অবলম্বনের লক্ষে সারদেশেই চালানো হচ্ছে প্রচার প্রচারনা। ভয়ানক এ মহামারি থেকে বাচতে নেয়া হচ্ছে নানাবিধ পদক্ষেপ। বিভিন্ন এলাকায় পরিচালনা করা হচ্ছে লকডাউনসহ নানাবিধ অভিযান। কিন্তু না কোন কিছুই যেন মানছে এ অদৃশ্য ঘাতক করোনা। এর সাথে যোগ হয়েছে বন্যা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। সব মিলিয়ে বানের পানি আর চোখের জলে একাকার দেশবাসী।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কমপক্ষে ১৩ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যমুনা, তিস্তা ও সুরমাসহ বেশ-কটি নদ-নদীর পানি বইছে বিপদসীমার ওপরে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে বেশ কিছু এলাকা। পানিবন্দি আছে লক্ষাধিক মানুষ। বন্যার এই তাণ্ডব কেবল শুরু হয়েছে। পুরো আগস্ট এমনকি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্যা প্রলম্বিত হতে পারে। ২৭ জুন থেকে চলা বন্যার এখনও বেশকিছু জেলার নিম্নাঞ্চলে পানি জমে আছে। নদ-নদীগুলোও পানিতে ভরপুর। এ অবস্থায় নতুন পানি দ্রুতই বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে বলে জানিয়েছেন বন্যা বিশেষজ্ঞরা। এতে উত্তর, পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের অন্তত ২৩টি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। প্রথম দফা বন্যায় রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও সচল হয়নি।

বন্যার পানিতে মাঠ ও গোচারণ ভূমির ঘাস মরে যাওয়ায় গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে রয়েছেন কৃষিজীবীরা। বানভাসিরাও পোহাচ্ছেন অন্তহীন ভোগান্তি। আমনের বীজতলা আবারও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কৃষক দিশেহারা। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক বর্গাচাষিরা চড়া সুদে আনা দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধের চিন্তায় চোখে সর্ষেফুল দেখছেন।

করোনা ও বন্যায় চরম ভোগান্তিতে দিন কাটছে বন্যাকবলিত এলাকা সমূহের গর্ভবতী মা ও সদ্যজাত শিশুদের। দুটি দুর্যোগের কারণে গর্ভবতী মা ও শিশুদের পুষ্টিকর খাবারের সংকটের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়েছেন তারা। এবিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ বলেন, শিশুদের ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার একটি বড় কারণ অপুষ্টিতে ভোগা। এ কারণে এদের মৃত্যুঝুঁকিও বেশি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে গর্ভবতী মা ও নবজাতক শিশুদের চাহিদামাফিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। তবে গর্ভবতী মা ও নবজাতক শিশুর চিকিৎসা এবং তাদের খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন দুর্ভোগের কথা জানতে পারলে সেগুলো নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকার।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী এ পর্যন্ত বন্যায় বেশ কয়েকজনের মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে অনেকে। আশ্রয়হীনের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। এরই মাঝে সমাগত ঈদ-উল আযহা। সব মিলিয়ে এ মূহুর্তে বানের পানি আর স্বজন হারানো চোখের জল এখন যেন একাকার হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই নদ-নদীর পানি বাড়ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে করে ঈদকে সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষদেরকেও পোহাতে হবে সীমাহীন দুর্ভোগ।

উদ্বেগের বিষয়, বানের পানিতে বাড়িঘর ডুবে যাওয়া মানুষ তাদের গবাদিপশু নিয়ে আশ্রয় নেয়ার মতো জায়গাও পাচ্ছেন না। বানভাসি মানুষ কোনোমতে রাস্তাঘাট, উঁচু জায়গা, খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নিলেও গবাদিপশুর খাবার জোগাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় মানুষের ভোগান্তি লাঘবের পাশাপাশি পশুর বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

এটা সত্য, বৃষ্টির ওপর আমাদের কোনো হাত নেই। কিন্তু বন্যার পেছনের দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি সারা বছর বাঁধগুলো ভালোভাবে দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করত, নদীগুলো ড্রেজিং করা হতো ও দখলমুক্ত রাখতে সরকার কঠোর হতো, তাহলে অতিবৃষ্টির পানি ও আকস্মিক বন্যাকবলিত ভোগান্তি কম হতো। ভৌগোলিক কারণে আমাদের নাজুক অবস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পানিসংশ্লিষ্ট সব খাতে নজরদারির ব্যবস্থা ও যে কোনো অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান এখনই নিশ্চিত করা দরকার।

আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবেযে, বন্যার কারণে কেবল প্লাবিত এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তা নয়। যে কোনো দুর্যোগে গোটা দেশবাসীকেই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। হাওরে বন্যায় চালের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছিল। এবার উত্তরাঞ্চলে বন্যায় আমন ধান ও গবাদিপশু ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। শিল্প-কারখানার উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পানি ব্যবস্থাপনা, বাঁধরক্ষা-উন্নয়ন-নির্মাণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপই ভবিষ্যতের রক্ষাকবচ হতে পারে।

একদিকে বন্যা, আরেক দিকে মহামারি করোনা আতঙ্ক এইমূহুর্তে পুরোদেশবাসীকেই বিষিয়ে তুলেছে। তারপরও সামনে ঈদ সমাগত। আসুন আমরা এবার নিজেদের কথা চিন্তা না করে যে যার মত করে ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। তাদের ব্যাথায় খানিকটা ব্যথিত হই। নিজেদের মত করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই। এটাই হোক আমাদের প্রত্যয়।


আরও পড়তে পারেন…..
মোট ৩৩ লাশ উদ্ধার : অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা
তদন্তেই সীমাবদ্ধ সব নৌ-দুর্ঘটনা : আর কত প্রাণ দিলে এর অবসান ঘটবে!
বাড়ির পাশে সিঙ্গুয়া নদী ।। এম জে এইচ বাতেন

সংশ্লিষ্ট বিষয়