রাইন আমার প্রিয় নদী : যেমন আত্রেয়ী আর আন্ধারমানিক ।। তুহিন শুভ্র মন্ডল

রাইন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

যে নদীর পারে আমার জন্ম, সেই আত্রেয়ী তো আমার প্রিয় হবেই। আমার মন-প্রাণ তাতে জুড়ে থাকবেই নদীর জলে সাথে মাছের মতো। কিন্ত যে নদী আমি দেখিনি কোনও দিন সে নদী? সে নদীও তো প্রিয় হতে পারে। যেমন রাইন।

তাকে যে মনশ্চক্ষে দেখেছি অনেকবার। শিরা উপশিরায় প্রবাহিত তার জলের ছন্দ। আর আন্ধারমানিক? তাকে দেখেছি একটা বৃষ্টি ঝিরঝির মায়াবী সকালে। সূর্যের আলো যার জলে হয়তো আমারই পূর্বপুরুষের ছবি এঁকে রেখেছিল। তাই তার কথা এত মনে হয়। ঢাকার সদরঘাটে বুড়িগঙ্গা থেকে এম ভি, সুন্দরবন লঞ্চে নদী সমূহের জলে ভাসতে ভাসতে,  জলের হাওয়ায় মন পবনের নাওকে দুলিয়ে দুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম পটুয়াখালির দিকে। গন্তব্য ছিল কুয়াকাটায় আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে। সে এক আশ্চর্য জলসফর।

সেই স্মরণীয় রাতের চাদর সরিয়ে আন্ধারমানিক এসেছিল আদরমাখা ওমের মতো। কি অনির্বচনীয় সকাল! আসলে পৃথিবীর সব নদীই আমার প্রিয়।যেমন চেতনায় মিশে আছে লন্ডনের টেমস, স্পেনের এব্রো আর গঙ্গা।আহা! আমার যদি একটা বজরা থাকতো আর আমার প্রিয় নদী গুলোতে ভেসে বেড়াতাম, হেসে বেড়াতাম। ওদের জলের বিছানায় গা এলিয়ে চলে যেতাম স্বপ্নের দেশে। সেসবদিন আর আসে না। তাই প্রবল মনখারাপ হয় আর সেই মনখারাপ জমা রাখি আরেক প্রিয় নদী হলং- এর কাছে। হলং আমার কাছে উপশম। মনের যাবতীয় দুঃখ, কষ্ট জমা রাখি হলং- এর কাছে।

তবু যে নদীর তীরে জন্ম হয় যার তার প্রতি প্রত্যেকের একটু হলেও পক্ষপাতিত্ব থাকে। তাই, আমারও আছে। আছে আত্রেয়ী নদীর প্রতি। যে নদী একটা জীবন হয়ে যায়। বেঁচে থাকার শ্বাস- প্রশ্বাস হয়ে যায়। সে তখন শুধু প্রিয় থাকে না। প্রিয়র থেকেও অধিক কিছু হয়ে ওঠে। আত্রেয়ী আমার জন্ম পেরিয়ে জন্মান্তরের দিকে নিয়ে চলে। যেখানে আমার ছেলেবেলা আছে। নদীর পাশে মাঠ আছে। এক আনা- দু আনায় খেয়া পারাপার আছে। যে খেয়া আমাকে নিয়ে যায় শেকড়ের কাছে।

শেকড়ের গায়ে জল সিঞ্চন করতে করতে
আমি দেখি ফেলি
বাবার নদী পেরিয়ে আসা অসহায় শৈশবকে
দেখি পূর্বপুরুষের হাহাকার
নিজেদের জন্মভিটার যে দাগ
এখনও লেগে আছে তাদের মনে
সেই দাগ দেখতে দেখতে আমার কাছে এক হয়ে যায়
আত্রেয়ী আর আত্রাই
আমার আজন্ম দোসর…..

এখন আত্রেয়ীর বুকে থাকা লেখার অক্ষর আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। অবশ্য সব নদীর বুকেই যে লেখা থাকে তা এখন অনুভব করি। অনুভব করি তাদের মনের কথা। কি লেখা আছে আত্রেয়ীর বুকে? একটা স্পষ্ট অভিমানের কথা। একটা মনখারাপের কথা। যন্ত্রনার কথা। আছে ভালবাসার কথাও। নদীর সাথে মানুষের। প্রাণের সাথে প্রাণের।

কেন প্রিয় হয় নদী?  নদী কি আমাকে জন্ম দেয়?  সরাসরি বললে না। কিন্ত তবু কেন প্রিয় হয়? এর উত্তর বোধহয় কেউই দিতে পারবেন না। নদীর জন্য করতে করতে একটা চেতনা জন্মায়। সেটাই ভালবাসা সৃষ্টি করে সেই নদীর প্রতি। সেই নদী প্রিয় হয়ে ওঠে। আবার বাবার বা মায়ের কাছে শোনা নদীর গল্পেও ধীরে ধীরে কখন যে প্রিয় হয়ে ওঠে নদী! এই যেমন আত্রেয়ী। বা আত্রাই। একই তো তারা। অভিন্ন দোসর তারা। বাবার মুখে ছেলেবেলার নদীপারাপার, ঘাটের কথা একটার পর একটা ভালবাসার পরত যোগ করে আমার হৃদয়ে। আচম্বিতে অনুভব করতে থাকি আত্রেয়ী আমার প্রিয়তমা। আত্রাইও।

দক্ষিণ দিনাজপুরের প্রধান নদী আত্রেয়ী
দক্ষিণ দিনাজপুরের প্রধান নদী আত্রেয়ী । ছবি- তুহিন শুভ্র মন্ডল

আমি যেন দেখতে পাই বাংলাদেশে যেখানে আমার বাবার জন্ম সেখানকার আত্রাই নদীতেও আমি ভেসে বেড়াচ্ছি। ছুঁয়ে আছি তাকে নাড়ীর যোগে। আবার এমনও তো হয় পূর্বপুরুষের কাছে, প্রিয়জনের কাছে যে নদীর কথা শোনা যায় তার কাছে শুনে শুনেই নদীর প্রতি একটা আত্মীয়তা অনুভব করা যায়। কেউ কেউ আবার একটা নদীর গল্প এমন ভাবে বলেন যেন প্রিয় হয়ে যায় নদী যেমন আত্রেয়ী। আত্রেয়ীর একটা গৌরব আছে। ঐতিহ্য আছে। দেবিপুরাণ, মহাভারত, রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রাবলীর পরিচয় আছে। দেশভাগেরও আগে একটা সমৃদ্ধ জনপদ আছে। বৈচিত্র্যময় মাছ সম্পদও তো আত্রেয়ী বা আত্রাইয়ের পরিচয়।

অথচ আজ? বর্ষার সময় ছাড়া জল থাকে না নদীতে। নদীর বুকে চর জেগে আছে প্রায়শই। জলহীনতায় মাছের বৈচিত্রময় প্রজাতিরা অভিমানে মুখ ফিরিয়েছে। অন্য নদীর মতো আত্রেয়ী নদী ও আত্মীয়তা গড়ে দেয় যে নদী জীবন দেয়, কর্ম দেয়, অন্ন সংস্থান দেয়, দেয় সংস্কৃতির ধারা তাতে মিলে মিশে যায় সভ্যতার কথা। তাতে মিশে যায় অগ্রগমনের কথা। আমার প্রিয় আত্রেয়ী নদীর বুকেও সে কথা লেখা আছে। এটাও লেখা আছে যে সে কষ্টে আছে। তাকে ভাল রাখার দায়িত্ব তার সন্তানদের। যারা তাকে প্রিয় বলি। তাকে না দেখেও পূর্বপুরুষের মুখে শুনে যারা তাকে ভালোবাসি।যাদের বুকে নদী চেতনা আছে তাদের দায়িত্ব অন্যের বুকে নদীচেতনা জাগানোর। নদীর প্রতি ভালবাসাও।

আত্রেয়ী আমার প্রিয় নদী এটুকু বলেই শেষ হয়ে যায় না দায়িত্ব। নদী কেন প্রিয় হয় আর প্রিয় কেউ হলে তার জন্য আমার কি করণীয় সেটাও ভেবে দেখতেই হবে। প্রিয় বলার অধিকার যদি পেয়ে থাকি তবে সেই অধিকার রক্ষায় আমারও দায়িত্ব আছে। সেটা বুঝে নেওয়া দরকার সর্বাগ্রে। আমার চাই শুধু একটা মন পবনের নাও।

আত্রেয়ী থেকে আত্রাই হয়ে চলে যাবো গঙ্গার কাছে। পথে ডেকে নেবো হলং আর আন্ধারমানিককে।তারপর সবাই মিলে ভেসে বেড়াবো টেমসের জলে।সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের ঠিকানায় নদীর জলে চিঠি লিখে রেখে চলে যাবো বাসেল (সুইজারল্যান্ড), স্ট্রসবুর্গ (ফ্রান্স) হয়ে চলে যাবো প্রিয় রাইনের কাছে।তাকে বলবো আত্রেয়ী আর আন্ধারমানিকের কথা। আমার প্রিয় নদীদের কথা। আমার জীবনের কথা।


আরও পড়তে পারেন….
এই মৃত নদী আমার তিস্তা না ।। শুভময় পাল
স্মৃতির লোহালিয়ায় আজও ভাসে মন ।। মো.ইউসুফ আলী
কালনির স্নিগ্ধতায় আমার ছেলেবেলা ।। আলম মাহবুব

সংশ্লিষ্ট বিষয়