আনন্দাশ্রু ফুলেশ্বরী

ফুলেশ্বরী
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রাইমারি শেষ করে সবে হাইস্কুলের চৌকাঠে পা রাখছি। বন্ধুদের সাথে সকাল বিকাল নদীতে ডুবসাঁতার মলাই খেলা আর স্কুলে যাওয়া আসা। খেলাধুলা মন ও মগজ অষ্টপ্রহর। স্কুলের তোতাপাখির মুখস্ত বিদ্যা ছাড়া মেধা ও মনন বিকাশের বয়স হয়নি।

খেলাধুলার ফাঁকে গ্রামে যেসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হতো তা হলো পালাগান, মহরমের জারি, ছায়াবানি দস্তর আলীর প্রেমকাহিনীর পুঁথিপাঠের আসর, বাউল সন্ধ্যা এইসব। রহিম বাদশা ও রূপবানের পালাগান ও ঝুমুর যাত্রানাট্যে মাঝিদের গান ও অভিনয় আজো মনে দাগ কাটে। এসবের বাহিরে আপডেট সাংস্কৃতিক মাধ্যম ছিলো বিটিভিতে মাসে একটি বাংলা সিনেমা ও ভাড়ায় চালিত ভিসিআর দেখা। দুরন্ত দামাল ছেলেরা সান্ধ্যকালীন অধিবেশনে মিলিত হতাম আজ কার বাড়িতে বিয়ে আজে খাৎনা আছে। বাজারে কার দোকানে হালখাতা আছে। অনুষ্ঠান শেষে রাতে ভিসিআর দেখাবে। একরাতে বিনে পয়সায় তিন চারটি সিনেমা দেখা যাবে। রাতে দলবেঁধে চলে যেতাম। অনেকে মা বাবাকে না বলে বাংলা ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে। কতো যে ক্ষতি হতো লেখাপড়ার আজ বুঝি।

আজকে আকাশ সংস্কুতির সবুজবাতি যেমন কেড়ে নিচ্ছে লক্ষ কোটি শিক্ষার্থীর মোমবাতি ঠিক তেমনি। ঠিক সে সময়কার একটি সিনেমা বড্ড দাগ কেটেছিলো মনে। আজো ভুলতে পারি না। সিনেমার নাম ফুলেশ্বরী। নায়িকা অঞ্জনা অভিনীত বাংলা সিনেমা। শেষদৃশ্যে নায়িকার অঝোরে ম্যারাথন ক্রন্দন আর বিরহের ব্যবচ্ছেদ পরিসমাপ্তি। সাথে সাথে অবুঝ দর্শক আমিও কেঁদেছি। সেকি কান্না! আজো ভুলতে পারি না।আমার বাড়ির সামনে দিয়ে বহমান নদী ফুলেশ্বরী আর নায়িকা ফুলেশ্বরীর ক্রন্দন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ। প্রথম জীবনের প্রেম ভুলি কি করে? যদি তা হয় ট্রাজেডি।

যে ফুলেশ্বরী শৈশবে আনন্দ দিয়েছে অশ্রু দিয়েছে তাকে ভুলি কি করে? যৌবনে কবিতার বাহার প্রেমের শীতল পরশ আর এখন দিচ্ছে নদী ও নারীর দর্শনের নিত্যতা। যে ছেলে নদীর পাড়ে বসে কবিতা লিখে, সে কি করে ভুলবে মানবস্বত্তার অপর নাম নদী। সভ্যতার সৃজনে নদী ও নারী মোহাবেশ পুরুষের তরে।শৈশবে খেলার সাথী যৌবনে গল্প আর কবিতার হানিমন বার্ধক্যে সময়ের সোনালী কাবিন প্রতিটা মানব মানবীর। পানি বিধৌত পললে সোনার ফসল যে মাটির বুক চিরে উঠে তা প্রকতির অনন্য স্বত্তা নদীমাতার অবদান। সেচে চাষে যুগল যেমন ব-দ্বীপের। তেমনি সংস্কৃতি সমাজ ও সভ্যতার অনঙ্কুরিত বীজের বীজতলা নদী।

বর্ষায় ফুলেশ্বরী নদী : দাউদপুর, বানাইল,তাড়াইল থেকে- ১০ জুলাই, শুক্রবার– ২০২০ সকালে ছবি তুলেছেন লেখক আফজল হোসেন আজম

নরসুন্দার শাখানদী ফুলেশ্বরী, সূতি ও বেতাই। বাংলার তেরোশত নদীর মতো ফুলেশ্বরীও আজ কাঁদছে।কিশোরগঞ্জের নীলগঞ্জ হতে নরসুন্দার শাখা হিসেবে তাড়াইলের তালজাঙ্গা রাউতি ইউনিয়ন হয়ে কেন্দুয়ার গগডা ইউনিয়ন হয়ে সেকান্দর নগর বোরগাঁও এর সামনে দিয়ে আবার তাড়াইলে নরসুন্দার সাথে মিলিত হয়েছে ফুলেশ্বরী নদী। পথে লক্ষ লক্ষ বছরের ট্র্যাজিটিক ইতিহাস ও নামকরনের স্বার্থকতা বিচার করে চলেছে যেন প্রকৃতি।

ফুলেশ্বরীর জন্মই যেন আজন্ম পাপ। ১৭৫৭ সনের প্রবল ভূমিকম্পে ফুলেশ্বরী বাকরুদ্ধ হয়। রাউতির কুঁড়পাড় নামক স্থানে। সেই থেকে খরস্রোতা ফুলেশ্বরী নদী মৃতঃপ্রায় একটি খালের আকার ধারণ করছে। এ যে সিনেমার ট্রাজেডিক মধ্য বিরতি। গত ২০১৮/১৯ অর্থ বছরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের টেন্ডারে ফুলেশ্বরী নদী খননের একটি প্রকল্প পাস হয়েছিলো। নোয়াখালীর এক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছিলো। নাড়া দিয়ে উঠেছিলো তীর লক্ষ লক্ষ মানুষ। এবার বাঁচবে আমাদের অন্নমাতা ফুলেশ্বরী।

শেষোতক হলো না স্বপ্নপূরন। বৈশ্বিক মহামারি থামিয়ে দিলো ফুলেশ্বরীর খনন। আসলে বিরহী পারুরা দেবদাকে পাবে কি করে? নিয়তি আর বৈষম্য এড়ানো যায় কি? যা এড়াতে পারিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলাকবি চন্দ্রবতী। এই ফুলেশ্বরীর তটে বসেই কবিতা লিখতেন। সান্ধ্যমাল্য দিতেন মন্দিরে। নিত্যকর্ম করতেন। বেচারা জয়ানন্দের প্রেমে পড়লেন কবি। নীচুকূলের জয়ান্দের কাছে কি করে কণ্যাদান করবেন? তাইতো ফুলেশ্বরীর বুকে ঝাঁপ দিলেন জয়ানন্দ। চন্দ্রাবতীও ঝাঁপ দিলেন সহমরনে। সলিল সমাধি ঘটলো জয়ানন্দ চন্দ্রাবতীর। কবিতার শেষ লাইনে সাম্যের গান গাইলেন কবি জীবন দিয়ে। নদী ও নারীর প্রজজনিত প্রেম বিরহের প্রেম আর সভ্যতার ঋন এখানেই স্বার্থকতা বাংলার ইলিয়ড, ইডিপাস তেরোশতো নদী।ফুলেশ্বরীতো তাদের কণ্যা। ফুল ফসলের একেকটা ঔষধি গাছ যেন একেকটা নদী।

বাংলা মঙ্গলকাব্যের প্রথম অসম্পুন্ন অনুবাদক ছিলেন দ্বীজবংশীয় রাজা বংশীদাস। ফুলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত তাড়াইলের বড়গ্রাম বর্তমানে বোরগাঁও বসেই রাজা বংশীদাস প্রথম মঙ্গলকাব্যের অনুবাদ শুরু করেছিলেন। শেষ করতে পারেননি।তারই কন্যা কবি চন্দ্রাবতীর হাতে প্রথম স্বার্থক অনুদিত হয় বাংলায় মঙ্গল কাব্যের। দস্যু কেনারামের খপ্পরে পড়ে এই ফুলেশ্বরী নদীতেই সর্বস্ব হারান বংশীদাস। ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন ময়মনসিংহ গীতিকার কেনারামের পালা লিখেন এই ফুলেশ্বরীর তীরে বসেই।

আজ থেকে শত বছর পরে যখন ছেলেপেলেরা ফুলেশ্বরীতে নৌকা বাইবে, সেচ কার্য করবে, আমি লাঠি ভর দিয়ে কোনোরকমে হেঁটে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখতে থাকবো…( যদি আল্লাহ বাঁচায়)। অতঃপর চোখে চশমাটা দিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে ফুলেশ্বরী তোমাকে যৌবনা দেখবো জল গড়িয়ে পরবে চোখ দিয়ে চশমা সরিয়ে চোখ মুছতে মুছতেই ভাববো…
জীবনের কত রাত যে নির্ঘুম কাটিয়েছি এই ঢেউয়ের খেলা দেখার জন্য!!
কতবার যে ফুলি ফুলি বলে চিৎকার দিয়ে উঠেছি।
বাচ্চা ছেলেরা এসে জিজ্ঞেস করবে কি গো দাদু, এখনো ফুলি!!! কি পেলেন?
আমি মৃদু হেসে বলবো,
লাভ- ক্ষতি ভেবে কি আর ভালোবাসা যায় রে….প্রথম জীবনের ভালোবাসাটা ভুলি কি করে?
জীবনের শেষ দিনগুলোতে কাঁপাকাঁপা হাতে ইউটিউবের সার্চ বক্সে লিখবো ‘ Fulassore my love,,
দেখতে থাকবো দুহাত উচিয়ে ছুটতে থাকা শৈশবের স্নান, কবিতার পটে কলমখাতার ঢালি নিয়ে বসে থাকা।
পাশ থেকে কেউ হয়তো বলে উঠবে… আর কতো?? এবারতো থামুন। কি পেলেন জীবনে? মৃতঃস্বত্তার সাথে পিরিত করে?
আমি মৃদু হেসে বলবো…..
লাভ- ক্ষতি ভেবে কি আর ভালোবাসা যায় রে….প্রথম জীবনের ভালোবাসাটা ভুলি কি করে?
জানি এই মেসেজটি কোনোদিন তোমার কাছে পৌঁছবে না…তবুও বলবো মিলনে হাসে প্রেম বিরহে কান্দে রে।স্বত্তার মিলন আর সভ্যতার জাগরণের চেয়ে বড় আনন্দ কিসের? ফুলেশ্বরী বাঁচলেই তোরা বাঁচবি।আর আমি ভালোবাসবো আমরণ। মায়ের সন্তান মাকেই ভালবাসবে।নদীমাতা যার সেদেশের সন্তানদের আবার কান্না কিসের? ফুলেশ্বরীর কান্না ঘুচলেই সন্তানেরা হাসবে। সুখের আনন্দাশ্রুতে হাসির টোল ভিজে নদীর ধারার মতো নামবে।

আরও পড়তে পারেন…..
নদীস্নানের পর কিছু একলা মুহূর্ত ।। হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার প্রিয় নদী সুবর্ণরেখা ।। সুকন্যা দত্ত
হালদা নদীকে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণা: যৌক্তিকতা ও বিশ্লেষণ

সংশ্লিষ্ট বিষয়