মেঘভাঙা বৃষ্টি ।। ইন্দ্রনীল সুমন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইন্দ্রনীল সুমন এর একটি নদী বিষয়ক গল্প  “মেঘভাঙা বৃষ্টি”

পড়ুন রিভার বাংলা ডট কমে

এক.  ডুলুং এখানে হলুদ বিনুনি কিশোরীর মতো, লাফিয়ে লাফিয়ে চলে, অকারণে উচ্ছল! এদিকটায় বোল্ডার বেশী, তাই ডুলুং এর জলের শব্দও বেশী| ডুলুং কথা বলে| নদীভাষায়| ইমন মজা পায়| বোঝার চেষ্টা করে নদীর ভাষা| যেন সাংকেতিক কোনো ভাষায় নদী কিছু বলতে চাইছে ইমনকে, আর ইমন মন দিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করছে তার অর্থ| প্রথম যেবার এসেছিল তখন ডুলুং এর কথা একেবারেই বুঝত না, আজকাল অল্প হলেও বোঝে| এই যেমন ডুলুং এখন বেলা বারোটার রোদমেখে খুশী খুশী মুখে ডাকছে ওকে, ভিজতে বলছে, ডুবতেও! যদিও ইমন জানে, হয়তো বা ডুলুংও জানে, ডুবিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ডুলুং এর আর নেই! ছিল একসময়! মনোহর বলেছে ইমনকে| মনোহর মাহাতো| হাতিখ্যাদার টঙ ঘরে বসে, চাঁদনী রাতে, ঘুঘুর মাংস দিয়ে মহুয়া খেতে খেতে বলেছে মনোহর, নদীর সুদিনের কথা, যৌবনের কথা| ভর ভরন্ত নদীর পায়ে কীভাবে বেড়ি পরলো, কীভাবে নদী বিগতযৌবনা হল অসময়ে, উন্নতির ফাঁসে বাঁধা পরলো তার সহজিয়া চলন,  সে গল্প শুনেছে ইমন, বহুবার|

হয়তো শুনেছে বলেই এখন আর মুখ ফুটে ডুলুংকে বলতে পারে না কথাটা| বলতে পারে না যে ডুলুং এখন আর কাউকে ডোবাতে পারবে না, ভাসাতেও না! একদিন বলেছিল, শুনেই ডুলুং এর জল যেন আরও কমে গেছিল অকস্মাৎ, থমকে গেছিল কিছুক্ষণ, খুব অপ্রস্তুত হয়েছিল ইমন| তুলি রেখে প্যান্ট গুটিয়ে নেমে গেছিল জলে, ডুলুং এর গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল| একটা হলুদ লেজওয়ালা পাখি এসে বসেছিল বোল্ডারে, লেজ কাঁপিয়ে ডেকে উঠেছিল টিট্রিউ টিট্রিউ আওয়াজে| উথলে উঠেছিল ডুলুং, মুহূর্তের জন্য! ফিরে পেয়েছিল শ্রাবণদিন, ঝুপ্পুস ভিজিয়ে দিয়েছিল ইমনকে| অবগাহন! দুপাশের পাহাড় থেকে তখন বিকেল গড়িয়ে নামছে|

দুই. ছোটনাগপুর মালভূমির পাহাড়ঘেরা এই জায়গাটায় ইমন এসেছে প্রায় মাসখানেক হতে চলল| এই নিয়ে সাতবার এল এখানে| এবারে একটু বেশীদিনই আছে| বাড়িতে বলে এসেছিল দশ বারোদিনের মধ্যেই ফিরবে| হয়নি| মন উঠছে না ফিরে যাওয়ার| গেল হপ্তায় বাড়িতে জানিয়ে দিয়েছে ক’দিন দেরী হবে| অবশ্য না জানালেও খুব কিছু ক্ষতি ছিল না| দাদা বৌদির সংসারে ওর থাকা না থাকার খুব কিছু গুরুত্ব নেই| মাসের শুরুতে সংসার খরচের ওর ভাগটা বৌদির হাতে দিয়েই এসেছে ও|

এইসব ভাবতে ভাবতে হাতে তুলি নিয়ে বসেছিল ইমন| ভৈরব মন্দিরের সামনের এই চাতালটা ওর খুব প্রিয়| এখানে এলে এই চাতালে শুয়ে বসে অনেকটা সময় কাটে ওর, সঙ্গী আঁকার বোর্ড কাগজ তুলি আর জেরিক্যান ভর্তি মনোহরদা’র ঘরে বানানো একনম্বর মহুয়া| মহুয়ার কথা ভাবতেই গলাটা যে শুকিয়ে গেছে সেটা টের পায়| জেরিক্যান খুলে গলায় ঢালে| ঢোক গিলে মুখটা একটু বিকৃত করে, পাশে রাখা ঠোঙা থেকে একটু নুন তুলে জিভে ঠেকায়| জিভের কষটে ভাবটা একটু কাটে| চাতাল থেকে নেমে যায় ডুলুং এর কাছে| জলে নামে| ছোট ছোট পাথরে সাবধানে পা রেখে নদীর মাঝামাঝি পৌঁছে যায়| একটা বড় বোল্ডার বেছে নিয়ে বসে তার উপর| হাঁটু অব্দি ডুলুং এর স্বচ্ছ জল| শীতল! পাথুরে ঠান্ডা জল যেন ইমনের পায়ের মধ্য দিয়ে উঠে আসে বুকে| জুড়ায় ইমন| দুপাশের জঙ্গল এগিয়ে আসে| একটা ছাতারে পাখি সপরিবারে এসেছে জল খেতে| তাদের অকারণ ওড়াউড়িতে ডুলুং এর খুশী যেন ধরে না! জলের স্রোত বাড়িয়ে দেয় সে| ইমনের চোখ বুজে আসে, জল বাতাস গাছের পাতা পাখির দল সবাই মিলে এক অদ্ভুত সুর তোলে, ঘুম নামে ইমনের চোখে| একটু জোর করেই উঠে পড়ে, জল ভেঙে এসে ওঠে ভৈরব মন্দিরের চাতালে| ছবিটা শেষ করতে হবে| অনেকদিন ধরে এই ছবিটা নিয়ে পড়ে আছে, কিছুতেই শেষ করতে পারছে না| নজর পড়ে আঁকার বোর্ডে| অসমাপ্ত ছবিটায় জামাই-এর আবছা মুখ| তাকিয়ে থাকে ইমন, জামাই-এর দিকে| ছবিটার দিকে|


আরও পড়তে পারেন…
মহাদেব ও ইছামতীর গল্প ।। সুজয় চক্রবর্তী
বরাকর একটি নদীর নাম ।। অতনু রায়
আমার নদী মধুমতী ।। রুখসানা কাজল

তিন. দুপুর জমাট হচ্ছে| জঙ্গলে দুপুরের আলাদা একটা গন্ধ আছে| পুরুষালি গন্ধ| এসময় পাখিরাও একটু জিরিয়ে নেয়| গাছের পাতা কম নড়ে, হয়তো ব্যাঘাত ঘটাতে চায় না ওদের বিশ্রামে| ইমনের চোখটা বুজে আসছিল, নেশাটা জাঁকিয়ে বসছে| তখনই শুকনো পাতায় আওয়াজ ওঠে| কেউ আসছে| ইমন ঘুরে তাকায়| বেঁটেখাটো একটা মানুষ হাতে টাঙি নিয়ে জঙ্গলের পথে এদিকেই আসছে| জামাই| ইমন একটা পাতলা কাপড় দিয়ে আঁকার বোর্ডটা ঢেকে দেয়| গলা তুলে ডাক দেয়|

-ও জামাই! এদিকে এসো!

ডুলুং এর দিকে নামতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় জামাই, তাকিয়ে থাকে ইমনের মুখের দিকে| ইমন একবার ঘাড় নেড়ে বলে-

-এসো, খেয়ে যাও খানিক!

একটু ইতস্তত করে এগিয়ে আসে জামাই, একটা শালপাতা কুড়িয়ে নিয়ে ডোঙা বানায়, ইমন ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞাসা করে,

-এদিকে কোথায়?

জামাই ইশারায় নদীর দিকে দেখায়|

-নদীতে? স্নান করবে?

দুদিকে মাথা দোলায় জামাই|

-তবে?

হাত মুখ নেড়ে কিছু বোঝাতে চায়, ইমনের মনে পড়ে| নদীর ঐ পাড়ে জঙ্গলে কিছু গাছ লাগিয়েছে জামাই, আগেরবার দেখিয়েছিল| ইমন বলে-

-ও হো! বুঝেছি! তোমার নিজের বাগান দেখতে যাচ্ছ?

নিজের বাগান কথাটায় যেন খুশী হয় জামাই, আদিম মুখটা ঝিলমিলিয়ে ওঠে, কোঁচড় থেকে দুটো চুট্টা বার করে একটা ইমনকে দেয়| ইমন দেশলাই বার করে ধরায়| ঠোঁটটা সরু করে একটা জোরে টান দিয়ে উঠে পড়ে জামাই| ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নদীতে নেমে যায়| পাথরে পা দিয়ে দিয়ে পার হয়ে যায়, একবার নিচু হয়ে হাত দিয়ে জল কাটে, যেন পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ডুলুং এর গায়ে| গতকাল রাতের কথা মনে পড়ে ইমনের|…বীরমণি মাহাতোর মাটির দোতলা লজের সামনের দাওয়ার খাটিয়ায় বসে আছে ইমন| রাতের খাওয়া সেরে আরাম করে একটা সিগারেট ধরিয়েছে| আলো অন্ধকারে খেয়াল করে প্রৌঢ় বীরমণি  টালমাটাল পায়ে রান্নাঘরের ওপাশে জামাই এর ঘরে ঢুকছে| এদিকে বারান্দায় কাঠের বেঞ্চিতে একথালা ভাত নিয়ে বসেছে জামাই, এতক্ষণ মহুয়া গিলছিল জামগাছের গোড়ায় বসে| একদলা ভাত ঢুকিয়ে দিচ্ছে নিজের মুখের ভিতরে আর ঘাড় ঘুরিয়ে বার বার তাকাচ্ছে রান্নাঘরের দিকে| রাতের আবছা আলোয় ইমন দেখে রান্নাঘর থেকে ফুলমোতিয়া বেরিয়ে আসছে| বারান্দার হ্যারিকেনের কাঁপা আলো ফুলমোতিয়ার পাথরে খোদাই শরীরটার উপর পড়ে, গায়ে জড়ানো ফুলফুল ছাপাশাড়িটা শরীরের ভাঁজগুলোকে আরও স্পষ্ট করেছে! ফুলমোতিয়া জামাই এর কাছে এল, একটা অ্যালুমিনিয়ামের বাটি উপুর করে দিল ওর থালায়, ইমনদের জন্য যে দেশী মুরগীর ঝোল হয়েছিল তার কিছু অবশিষ্টাংশ ছিল হয়তো| সেটাই মনে হয় ঢেলে দিল জামাই এর থালায়! শব্দ করে বাটিটা বেঞ্চে রেখে প্লাস্টিকের জগে রাখা জল দিয়ে হাতটা ধুয়ে নিল| তারপর জামাই এর দিকে একবার তাকিয়ে ঘেন্না ভরা গলায় বলল-

-খা! জম্মের খাওয়া খা ক্যেনে! শাল্লো মরদ!

কথাটা বলেই দপদপিয়ে চলে গেল জামাই এর ঘরে| একটু আগে যেখানে বীরমণি গিয়ে ঢুকেছে| জামাই ফুলমোতিয়ার চলে যাওয়াটা দেখল ঘাড় কাৎ করে, তারপর আরও বেশী করে ভাত মুঠোয় নিয়ে ঢুকিয়ে দিতে লাগলো মুখের ভিতরে| যেন প্রচন্ড খিদে মেটাচ্ছে! উদগ্র খিদে! ওর খাওয়ার ভঙ্গী দেখে ইমনের গা টা গুলিয়ে উঠল, বমি আসছে! তাড়াতাড়ি উঠে কিছুটা জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেল ও| তৃতীয়ার চাঁদ তখন লখাইসিনি পাহাড়ের মাথায় ঝুলছে|

চার. ইমন প্রথমবার যখন এসেছিল আর্ট কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে, তখনই জামাইকে দেখেছিল| বীরমণির কাছে ফাইফরমাশ খাটে একটা ছোটখাটো চেহারার ছেলে| বীরমণি উঠতে বসতে ধমকায়, মুখে রা কাড়ে না ছেলেটা! পরেরবার এসে জেনেছিল, নদীর ঐ পাড়ের কোনো এক গ্রামের ছেলে, ছোটবেলায় বাপ মা হারিয়ে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াত, বীরমণি নিয়ে এসে মাঠের কাজে লাগিয়ে দেয়| ছেলেটা বোবা, বোধবুদ্ধিও কম মনে হয়! সেই ছোটবেলাতেই কে যে ওর নাম জামাই দিয়েছিল আর কেনই বা দিয়েছিল এরকম অদ্ভূত একটা নাম, তা অবশ্য কেউ বলতে পারেনি! জামাই একথালা ভাত খায়, অসুরের মতো খাটে আর রাত হলে ভরপেট্টা মহুয়া খেয়ে খাটিয়ায় মরার মতো পড়ে থাকে| বীরমণির একটা বিনে মাইনের মুনিষ জুটেছে, ইমনকে সেবারে বলেছিল মনোহর| গতবার এসে ইমন দেখেছে বীরমণি জামাইয়ের বিয়ে দিয়েছে! ঘরে এনেছে ফুলমোতিয়াকে, ভাস্করের হাতে পাথর খুদে তৈরি করা শরীর সেই মেয়ের, জামাইয়ের বকলমে আধবুড়ো বীরমণির ফূর্তির ব্যবস্থা হয়েছে পাকাপাকিভাবে| তবু এইভাবে বিয়েটা দিয়ে বীরমণি জামাইয়ের নামটাকে সার্থক করেছে ভেবে একা একাই হেসে ফেলে ইমন!

পাঁচ. দিনকয়েক ছবি আঁকার কাজে ডুবে ছিল ইমন| তুলি আর রঙ নিয়ে সময় কোথা দিয়ে কেটেছে খেয়ালই করেনি| গতকালও অনেক রাত করে শুয়েছে| সকালে ঘুম ভেঙেছিল একবার, উঠতে ইচ্ছা করেনি, আবার বালিশ আঁকড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল| হঠাৎ ধামসার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল| হাত ঘড়িটা নিয়ে দেখলো প্রায় ন’টা| ধড়ফড়িয়ে উঠে বসতেই অনেক লোকের কথাবার্তা শুনতে পেল| বীরমণির মাটির লজের দোতালার এই ঘরে একটা ছোট জানালা আছে| সেটা দিয়ে উঁকি দিল ইমন| সামনের জামগাছের তলায় ভীড় জমেছে| গাছের গোড়ায় একটা কাঠের চেয়ারে বীরমণি বসে| তামাক খাচ্ছে| ওদিকে নবীন ধামসা বাজিয়ে লোক ডাকছে| উল্টোদিকের জমির আল ধরে পিলপিল করে ছুটে আসছে বাচ্চার দল, পেছনে তাদের মায়েরা| ইমন ঘরের ভিতরে গিয়ে একটু জল খায় তারপর সিগারেট ধরিয়ে এসে আবার জানালায় দাঁড়ায়| ভালো করে বোঝার চেষ্টা করে পুরো ব্যাপারটা| আর তখনই খেয়াল করে বীরমণি মাহাতোর সামনে যে অর্ধচন্দ্রাকৃতি ভিড়টা তৈরি হয়েছে তার কেন্দ্রে একটা ছোটখাটো চেহারার মানুষ| মাটিতে বসে| দুই হাঁটুর মাঝখানে যে লোকটা মাথা গুঁজে আছে তার মুখ না দেখতে পেলেও চেহারা আর নোংরা খেঁটো ধুতি দেখে ইমন বুঝতে পারে| জামাই|

ভীড় ততক্ষণে জমে উঠেছে| নবীন ধামসা থামিয়ে সকলকে জানিয়ে দেয় যে আজ পঞ্চায়েত বসেছে| জামাইয়ের বিচার হবে| জামাইয়ের করা অপরাধ যথেষ্ট গুরুতর| সরকারি কাজে বাধা দিয়েছে সে| ময়ুরঝর্ণার কাছে যেখানে বাঁধ দিয়েছে সরকারিবাবুরা জামাই সেখানে গেছিল রাত থাকতে, টাঙ্গি দিয়ে বাঁধ কাটবার চেষ্টা করেছিল| ভাগ্য ভালো নাইটগার্ড দেখে ফেলে| ওকে ধরে বেঁধে রেখেছিল বিট অফিসে| সকাল হলে খবর পাঠায় গ্রামে| বীরমণি মাহাতো নিজে গিয়ে বহু কষ্টে ছাড়িয়ে এনেছে ওকে| নইলে এতক্ষণে সদরে চালান হয়ে যেত সে| আজ মাহাতো ছিল বলে এ যাত্রায় রক্ষা পেল জামাই|

এই অব্দি শুনেই ইমনের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল| ওর মনে পড়ে দিনকয়েক আগে ডুলুং এর পারে বসে জামাইকে বলা কথাগুলো| সেদিন সারারাত ছবির কাজ করে ভোরবেলা বেরিয়ে পড়েছিল ইমন| ঘুম আসছেনা দেখে ভাবল একটু হেঁটে আসবে| তখনও সূর্য ওঠেনি, পূবদিক সবে একটু ফর্সা হয়েছে| পশ্চিম আকাশে তখনও ফ্যাকাশে নষ্টচাঁদ রয়ে গেছে| পায়ে শিশির মাখতে মাখতে নিঝুম জঙ্গল দিয়ে হাঁটছিল সে| অল্প কয়েকটা পাখি ডাকছে মাঝেসাঝে| মহুয়া ফুলের টুপটাপ ঝরে পড়ার শব্দের একটা নেশা লেগে যায়| নেশাটাকে আর একটু জারিয়ে নিতে সিগারেট ধরায় ইমন| দুপাশের দীর্ঘ শালগাছের দল সরে গিয়ে ওর পথ করে দেয়| জঙ্গলের পথ দিয়ে নদীর ধারে নামতে থাকে| হাওয়াই চটিটা খুলে রাখে একটা গাছের নীচে| নামার সময় সাবধানে পা ফেলতে হয় এ পথে| ছোট ছোট নুড়ির উপর সারারাতের কুয়াশা আর শিশির পড়ে পিছল হয়ে থাকে| দু-পায়ের বুড়ো আঙুল ভাঁজ করে মাটি আঁকড়ে চলতে হচ্ছে, সামান্য অন্যমনস্ক হলে পা হড়কে সোজা নেমে যাবে জলে| যদিও জানে ডুলুং তাকে ডোবাতে পারবে না, তবু ভোর ভোর এই হিমশীতল জলে সর্বাঙ্গ ভিজলে পরে ঠান্ডা লাগবে নিশ্চিত, সঙ্গে নুড়ি পাথরের আদরের জ্বালা তো আছেই!  আলোও খুব কম, ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় নদীর কাছে| তখনই আবছা আলোয় দেখে জামাই বসে আছে, ডুলুং এর পাড়ে| পা টিপে টিপে ওর কাছে যায় ইমন, দেখে গোড়ালি ডুবিয়ে বসে আছে জামাই| জল কাটছে হাত দিয়ে| পাশে বসে ইমন, জামাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়| ওর চোখে জল| জামাই কাঁদছে! বিস্মিত ইমন হাত রাখে জামাইয়ের কাঁধে, জানতে চায় কী হয়েছে? এভাবে এখানে বসে কাঁদছে কেন ও? জামাই যেন লজ্জা পায়, মুখ লুকায় হাতের ভাঁজে| শরীর কাঁপিয়ে শিশুর মতো কেঁদে ওঠে! অবোধ্য কিছু আওয়াজ করে মুখ দিয়ে| ইমন আরেকটা সিগারেট বার করে নিজের সিগারেট থেকে ধরিয়ে এগিয়ে দেয়| সেটা নিয়ে খুব জোরে জোরে কয়েকটা টান দেয় জামাই| একটু যেন ধাতস্থ হয়| ইমন আবার জানতে চায় কান্নার কারণ| জামাই নদীতে নেমে হাঁটুজলে দাঁড়ায়, তারপর ইশারায় আকাশের দিকে আঙুল দেখায়| মরা চাঁদটাকে দেখিয়ে হাতের তর্জনী দেখিয়ে বৃত্ত আঁকে| ইমন বলে, “পূর্ণিমা?” -সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে জামাই| দু-হাত তুলে ছয় আঙুল দেখায়| ইমন এবার বলে,”ছয় পূর্ণিমা?” আবার মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বলে জামাই, নিজের হাঁটু অব্দি জল ছুঁয়ে কোমরে হাত দেয়| ইমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো জামাই এর ইশারার অর্থ উদ্ধার করতে থাকে|

-মানে জল! জল কোমর অব্দি ছিল! ছয় পূর্ণিমা আগে? তাই তো!

জামাই জোরে জোরে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়! ছ-মাস আগেও এখানে নদীর জল কোমর ছুঁতো, এখন তা হাঁটুতে নেমে এসেছে! তাই জন্য একটা মানুষ, এই রাত আর ভোরের সন্ধিক্ষণে নদীর পাড়ে বসে চোখের জল ফেলছে! ইমন অবাক হয়ে দেখতে থাকে এই ফোলা নাক পুরু ঠোঁট  খোদা খোদা মুখমন্ডলের মালিক কালো কুচকুচে আদিম মানুষটাকে| ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি! ডেকে পাশে বসায় জামাইকে| আস্তে আস্তে বুঝিয়ে বলে সমস্তটা| কেন বাঁধ দিচ্ছে সরকার, তাতে কীভাবে চাষের সুবিধা হবে, ময়ূরঝর্ণার ওখানে বাঁধ দিয়ে জল আটকে জলাশয় তৈরি হবে, তাতে হাতির দল জল খেতে আসবে, ট্যুরিস্ট লজ হবে, ওয়াচ টাওয়ার হবে! এতসবের জন্য তো বাঁধটা জরুরী, আর বাঁধ দিলে এদিকটায় ডুলুং এর জল তো কমবেই! পুরোটা চুপ করে শুনলো জামাই, তারপর হঠাৎই উঠে হাঁটা মারলো নদীর গা ধরে ধরে, উজানের দিকে, ময়ূরঝর্ণার দিকে, বাঁধের দিকে| ইমন একবার ডাকল, লাভ হল না| একটু আগেও ইমনের মনে হচ্ছিল যে ও জামাইয়ের সঙ্গে কমুনিকেট করতে পারছে, জামাইয়ের কথা বুঝতে পারছে, জামাইকে বুঝতে পারছে… এখন মনে হল ভুল ভেবেছে ও! কিচ্ছু বোঝেনি| হনহন করে হেঁটে চলে যাচ্ছে জামাই| নদী একটু পরেই বাঁক নিয়েছে| সেখান থেকেই চোখের আড়ালে চলে গেল জামাই! জামাইয়ের মনটাও ডুলুং এর মতো, মিলিয়ে গেল! সূর্য তখনও ওঠেনি| অথবা উঠলেও জঙ্গল পার করে আলো এসে পৌঁছায়নি এখানে| কিছুটা চুপ করে বসে থাকে ইমন, তারপর ফিরে আসে, গ্রামের দিকে|

বুড়ো জটা মাহাতোর চিকণ গলার চিৎকারে চিন্তাজাল ছিঁড়ে যায় ইমনের| তাকিয়ে দেখে সবাইকে ধমকেধামকে চুপ করাচ্ছে জটা| তারপর চুট্টার আগুনটা পাথরে ঘষে নিভিয়ে কানে গুঁজে রেখে বলে যে বীরমণি জামাইকে ছাড়িয়ে এনেছে, তাই বীরমণিই ওর শাস্তি ঠিক করবে| ভুড়ুক ভুড়ুক করে তামাক টানছিল বীরমণি| হুঁকোটা জটার হাতে দিয়ে কাঁচাপাকা গোঁফ এ তা দিতে দিতে বলে,

-দেখো মাতব্বরেররা! এমন বেলাইন কাজ তো ছোঁড়া এই পেত্থমবার করলো না, আগেও করেছে, আমাকে পাঁচজনে অনেকবার বলেছে ওকে দূর করে দিতে| আমার দয়ার শরীর, ভাবি এই বোবাহাবাটা কোথায় যাবে কী খাবে! তাই রেখে দিলাম, বিয়াশাদি করালাম, ঘর বসিয়ে দিলাম| তো আগে যা করেছে তা করেছে, ধমকেচমকে ছেড়ে দিয়েছি! কিন্তুক এবারটা তো বাড়াবাড়ি করে দিল! এক্কেবারে সরকারি কাজে টাঙি চালিয়ে দিল! আমারতো একটা মান আছে না কি পাঁচগায়ে! সরকারি অফিসার আমাকে মাহাতোবাবু বলে, বিলিতি সিগ্রেট খাওয়ায়! আর আমারই লোক কী না এই কাজ করলো! আমার মাথাটা পুরো কাটা গেল কি না বল তোমরা? কীগ্য জটা মনোহর নবীনের বাপ? তোমরা কি মুখে তামাক ঠেসে বসে আছো না কি?

বীরমণির কথা শেষ হতেই সবাই হৈ হৈ করে তাকে সমর্থন করে| এ হেন অন্যায়ে যে শুধু বুঢ়া মাহাতোর মাথাই কাটা গেছে তা নয়, গোটা গায়ের বদনাম হয়েছে! এর একটা বিহিত এখনই করতে হবে| উপযুক্ত শাস্তি একটা ওর হওয়া দরকার! আর সেটা যে মাহাতোরই ঠিক করা উচিত এ ব্যাপারে সবাই একমত| জামাই মাথা হাঁটুর ফাঁকে ঢুকিয়ে একইরকম বসে আছে| ইমন শুধু দেখেছে একবার যখন ওর ঘর বসানোর কথা হচ্ছিল তখন মাথা তুলে বীরমণির দিকে তাকিয়েছিল| এছাড়া পুরো সময়টাই সে মাথা নিচু করেই ছিল|

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সভা ভঙ্গ হল| বীরমণি মাহাতোর দয়ার শরীর| মারধর করার বিধান সে দেয়নি| শুধু বলেছে মনোহরের জমির পশ্চিমে তার যে চারবিঘা জমি আছে, সেটা দুদিনে চষে দিতে হবে| হাল বলদ সে-ই দেবে| কিন্তু সময় ঐ দুদিন| আষাঢ় মাস পড়তে চলেছে, তার আগেই ঐ জমি তার তৈরি চাই| বীরমণির উঠোনে বসে মহুয়া জ্বাল দিচ্ছিল ফুলমোতিয়া আর বীরমণির বউ! বীরমণির বিধান শুনে ফুলমোতিয়া কোমরে আঁচল গুঁজে সভায় গিয়ে মৃদু আপত্তি জানিয়েছিল, বলেছিল যে ওই জমি দুদিনে একটা মানুষ চষতে পারবে না, অন্তত দুটো মুনিষ এর চারদিনের কাজ! কিন্তু বীরমণি তাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছে যে জামাইকে ছাড়াতে তার দু-দুটো মুরগী আর তিনটে পাঁচ লিটারের মহুয়ার ক্যান গচ্চা গেছে! সরকারি বাবুরা কি এমনি ছেড়েছে! তা এত খরচা কী ফুলমোতিয়া দেবে না তার বোবা মরদ দেবে! তবু ফুলমোতিয়া যখন বলছে সে না হয় জামাইকে কাজ শেষ হলে একদিন ভরপেট্টা মাংসভাত খাইয়ে দেবে! সবাই একথা শুনে ধন্য ধন্য করতে করতে বাড়ির পথ ধরল| বেলাও অনেক হয়ে এল| সকলেরই মেলা কাজ পড়ে আছে| ইমন ভাবতে থাকে জামাইয়ের কথা| ওর গায়ে মহিষের জোর আছে, তবু একা হাতে এতটা জমি…দুদিনে…!

ছয়.  তন্ময় হয়ে ছবি আঁকছিল ইমন| জামাইয়ের পোর্ট্রেট অনেকদিন ধরেই শেষ করতে চাইছে! হচ্ছে না| অদ্ভূত মানুষ এই জামাই! এত অভিব্যক্তিহীন চোখ! এর পোর্ট্রেট আঁকা যে কী দুস্কর তা হাড়ে হাড়ে বুঝছে ইমন| তবু জেদ চেপে গেছে| কাল সারারাত ধরে তুলি নিয়ে বসেছিল| ভোরের দিকে চোখ লেগে আসায় ঘর থেকে বেরিয়ে  নিচে নেমে আসে, একটা সিগারেট ধরায়, আর তখনই খেয়াল করে একটা নারীমূর্তি! পুকুরের ধার ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছে! ফুলমোতিয়া! এত ভোরে! কোথায় যাচ্ছে? মনোহরের বাড়ির পাশের পথ ধরল! তবে কী বীরমণির জমিতে যাচ্ছে? গতকাল সারাদিন জামাই জন খেটেছে ঐ জমিতে! আজ দ্বিতীয় দিন! শাস্তির শর্তানুযায়ী আজ শেষ করতে হবে কাজ! যা প্রায় অসম্ভব! ফুলমোতিয়া সেদিকেই যাচ্ছে মনে হয়! পিছু নেয় ইমন!

জমিতে হাল দিচ্ছে জামাই! এই কাকভোরেই লেগে গেছে কাজে! কুয়াশা কাটে নি এখনও! আবছা আলোয় জামাইকে দেখে ইমনের মনে হয় পৃথিবীর প্রথম মানুষ! বেঁটে গাট্টাগোট্টা জোয়ান মুখে অদ্ভূত আওয়াজ তুলে বলদদুটোকে দিয়ে জমি চষাচ্ছে| ফুলমোতিয়া কাছে গিয়ে মুখ দিয়ে আওয়াজ করে, বেশ কয়েকবার আওয়াজ করার পরে শুনতে পায় জামাই| এগিয়ে আসে| ফুলমোতিয়া কাপড়ের পুঁটলি থেকে একটা ছোট হাড়ি বের করে দেয়| জামাই মাথা নেড়ে আপত্তি জানায়, মাঠের দিকে আঙুল তুলে দেখায়| ফুলমোতিয়া জোর করে| হাত ধরে বসিয়ে দেয় আলের উপর| সামনে হাড়িটা ধরিয়ে দেয়| জামাই একবার ফুলমোতিয়ার দিকে তাকিয়ে খেতে শুরু করে| ইমন দূর থেকে আন্দাজ করে ওটা পান্তা! ফুলমোতিয়া লুকিয়ে পান্তা নিয়ে এসেছে মরদের জন্য| জামাই গোগ্রাসে গিলছে দেখে ফুলমোতিয়া বলে ওঠে

-ধীরে খাও কেনে! কেউ লিয়ে যাবেক নাই!

বলে খিলখিল করে হেসে ওঠে| জামাই মাঠের দিকে ইঙ্গিত করে| ফুলমোতিয়া হঠাৎ শাড়িটাকে গাছকোমর করে বেঁধে দৌড়ে নেমে যায় মাঠে| জোয়াল কাঁধে চাপিয়ে চষতে শুরু করে জমি! ইমন অবাক হয়ে দেখতে থাকে! খাওয়া থামিয়ে কালো মুখের মধ্য দিয়ে সাদা ধবধবে দাঁত বার করে জামাই হাসছে! হাসছে জামাই! ফুলমোতিয়ার ছেলেমানুষী দেখে প্রাণখুলে হাসতে থাকে সে| এতবার এসেছে এখানে, এই প্রথম জামাইকে হাসতে দেখল ইমন! ওর চোখে জামাইয়ের অসমাপ্ত পোর্ট্রেট ভেসে উঠল| ফেরার পথ ধরল ইন্দ্র! খুব তাড়াতাড়ি ঘরে পৌঁছাতে হবে| ছবিটা! ছবিটা শেষ করতে হবে!

সাত. সেদিন রাতে অসহ্য গরমে ঘরে থাকতে না পেরে বাইরে আসে ইমন| আকাশের দিকে তাকায়| আকাশটা পুরো লাল হয়ে আছে| একটা গাছেরও পাতা নড়ছে না| সারা পৃথিবী মনে হচ্ছে ভয়ংকর কিছু একটার অপেক্ষায় আছে! প্রচন্ড একটা ঝড় যেন বুড়ো পাহাড়টার ঐ পাড়ে এসে ওৎ পেতে আছে! যেকোন সময় দলবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে| গুমোট দমবন্ধ করা পরিবেশ! জমিয়ে একটা বৃষ্টি হওয়া দরকার! না হলে গরমে টেকা দায়! ইমন দেখল জামাই দাওয়ায় বসে নেশা করে ঝিমোচ্ছে! পাশে মহুয়ার জার| পাশের উঠোনের পরে রান্নাঘর! তার সামনে দাঁড়িয়ে বীরমণির বউ আর ফুলমোতিয়া, একটু দূরে দাঁড়িয়ে টলছে বীরমণি! জড়ানো গলায় ডাকছে ফুলমোতিয়াকে| ওর সঙ্গে ঘরে যেতে বলছে| ইমন বুঝতে পারে ফুলমোতিয়া যেতে চাইছে না! বীরমণির বউও তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে| বলছে-

-এই তিনটে দিন ওকে ছাড়্ না কেনে! বেটির শরীরট ঠিক নাই বইলছে তো! তোর শরীরে কি দয়ামায়া বলে কিছুই নাই ?

বীরমণি ফুঁসে ওঠে!

-এখন ওর শরীর বেচাল হইয়ে গেল্য! রাত থাইকতে গিয়ে পশ্চিমের জমিতে হাল চড়ালো! জামাইয়ের খিদমত খাটলো! তখন শরীর খারাপ হয় না? এ ফুলমোতীঅ! চল্ ! ঘর চল্! দরদ দেখানো মরদকে! শাল্লো! তুই এখনই যদি না গেছিস আমার সঙ্গে তো কাল সকালে তোর মরদকে আমি জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেবো বলে দিলম! ভালো চাস তো ঘরকে আয়!

বীরমণি টলতে টলতে ফুলমোতিয়ার ঘরে চলে যায়! পিছন পিছন অসহায়ের মতো ফুলমোতিয়াও! ইমন জামাইয়ের দিকে তাকায়! জামাই মহুয়ার জারটা উপুড় জরে গলায় ঢালছে! ওদিকে বীরমণির বউ বীরমণিকে গালিগালাজ করতে করতে নিজের ঘরে চলে যায়| ইমন সিগারেট ধরিয়ে খাটিয়ায় বসে| মাথাটা পুরো জ্যাম হয়ে আছে| টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়! জঙ্গলে হাওয়ার ঘোর লেগেছে! গুমগুম আওয়াজ উঠছে থেকে থেকে! মরসুমের প্রথম বৃষ্টি! ইমন খাটিয়াটা নিয়ে দাওয়ায় উঠে আসে| এর মধ্যে শুনতে পায় ফুলমোতিয়ার ঘর থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছে! ক্রমশ বাড়ছে সেটা! সঙ্গে বীরমণির জান্তব চিৎকার শোনা যাচ্ছে! ইমন আবার জামাইয়ের দিকে তাকায়! জামাই খালি জারটা উপুড় করেছে মুখে! কিচ্ছু নেই দেখে ছুড়ে ফেলে দেয়! চোখমুখ ঠিকরে বেরুচ্ছে! খুব জোরে ফুলমোতিয়ার আর্তনাদ শোনা যায় আরও একবার!  জামাই উঠে দাঁড়ায়, চালের নিচে থেকে টাঙ্গি বার করে চিৎকার করে ওঠে! ক্ষ্যাপা বাইসন যেন! হঠাৎ ইমনকে অবাক করে দিয়ে জামাই বীরমণির নামে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে থাকে! ইমনের নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না! জামাই কথা বলছে! কতগুলো কুৎসিত গালিগালাজ! কিন্তু অর্থবহ! এতদিন ধরে যাকে জেনে এসেছে বোবা বলে সে কথা বলছে! ইমন বিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে! ওদিকে বুড়ো পাহাড় থেকে হাজার হাতীর দলের মতো ঝড় নামছে! মনে হচ্ছে আজ সব ভেঙেচুরে তছনছ দেবে! বিদ্যুৎ এর ঝলকে ইমন দেখতে পায় জামাই ছুটে গেল ফুলমোতিয়ার ঘরের দিকে! এক লাথিতে খুলে ফেলে দরজা! ভয়ংকর একটা হুঙ্কার দিয়ে সোজা ঢুকে যায় ঘরের ভিতরে! একটা হুটোপুটির শব্দ শোনা যায়, তারপরেই বীরমণির মরণ চিৎকার! জামাই ফুলমোতিয়ার হাত ধরে বেরিয়ে আসে| জংলা ছাপা শাড়িটা কোনোমতে জড়ানো ফুলমোতিয়ার গায়ে| একহাতে টাঙি অন্য হাতে ফুলমোতিয়াকে ধরে আছে জামাই! দুজনে ছুটতে শুরু করে! বৃষ্টি আর ঝড় ততক্ষণে জঙ্গল মাতাচ্ছে! ওরা ছুটে চলে যায় ভৈরব মন্দিরের দিকে, ইমনও পেছন পেছন দৌড়তে থাকে| পিছল পথে বারকয়েক আছাড় খায়, তবু পিছু ছাড়ে না ইমন, ভৈরব মন্দির থেকে নদীর দিকে নেমে যায় জামাইরা, রক্তমাখা টাঙ্গি ছুঁড়ে ফেলে নদীর পাশ দিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যায়! ওদের আর দেখতে পায় না ইমন! মেঘভাঙা বৃষ্টি তখন ভাসিয়ে দিচ্ছে চরাচর! ইমন ভয়ংকর একটা আওয়াজে চমকে ওঠে, সম্ভবত ময়ূরঝর্ণার বাঁধ ভেঙেছে! হরপা বান এসেছে নদীতে! মুহূর্তের মধ্যে লাফ দিয়ে নদীর পাড় ছেড়ে উঠতে থাকে ইমন, কোনোরকমে ভৈরব মন্দিরের দাওয়ায় ওঠে, নদীর দিকে তাকিয়ে দেখে বাঁধভাঙা জলে নদী উথালপাথাল! অবাক বিস্ময়ে দেখে নদীর ভয়াল প্রমত্ত রূপ| অপার বিস্ময়ে ইমন দেখতে থাকে ডুলুংকে! মনোহর মাহাতোর টঙ ঘরে বসে শুনেছিল নদীর এই রূপের কথা! ডুলুং তার যৌবন ফিরে পেয়েছে যেন! পাগলের মতো সামনে যা পাচ্ছে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে! ভৈরব মন্দিরের দাওয়ায় ইমন ঘোর লাগা মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকে! দেখতে পায় অর্ধেক ডুবে যাওয়া একটা গাছের ডালে আটকে যায় ভেসে আসা জংলা ছাপা শাড়িটা, প্রবল হাওয়ায় উড়তে থাকে পতাকার মতো|


আরও পড়তে পারেন….
সিংগুয়া নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দূষণ প্রতিরোধ ও খননের দাবি রিভার বাংলার   
লাবণ্যবতী একটি স্রোতের নাম ।। সুস্মিতা চক্রবর্তী            
হামিদ কায়সার এর গল্প- ডুব

সংশ্লিষ্ট বিষয়